শিরা / শিরাতন্ত্র (Vein / Venous System)

From LTRC
শিরা (Vein)
মানবদেহের প্রধান শিরাতন্ত্র
মানবদেহের সংবহনতন্ত্রে প্রধান শিরাসমূহের বিন্যাস
শারীরস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় বিবরণ
ল্যাটিন নাম: vena (বহুবচনে: venae)
তন্ত্র: সংবহনতন্ত্র (Circulatory system)
রক্তের ধরণ: অক্সিজেনবিহীন দূষিত রক্ত (ব্যতিক্রম: পালমোনারি শিরা বিশুদ্ধ রক্ত বহন করে)
রক্তপ্রবাহের দিক: দেহের বিভিন্ন প্রান্ত ও অঙ্গ থেকে হৃদযন্ত্রের (ডান অলিন্দের) দিকে
অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য: পাতলা প্রাচীর, প্রশস্ত লুমেন এবং রক্তের বিপরীত প্রবাহ রোধে একমুখী কপাটিকা (Valves) যুক্ত
চাপের মাত্রা: নিম্নচাপযুক্ত ও অ-স্পন্দনশীল স্থির রক্তপ্রবাহ
ক্লিনিকাল ব্যবহার: রক্ত সংগ্রহ (Venipuncture), স্যালাইন ও ইন্ট্রাভেনাস (IV) ইনজেকশন প্রয়োগ

শিরা (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো মানবদেহ ও মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রক্ত সংবহনতন্ত্রের সেই সকল নমনীয় রক্তনালী, যা দেহের বিভিন্ন কলা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে ব্যবহৃত, কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত এবং অক্সিজেনবিহীন রক্তকে কম চাপে পুনরায় হৃদযন্ত্রের ডান অলিন্দে ফিরিয়ে আনে। ব্যতিক্রম হিসেবে কেবল ফুসফুসীয় শিরা (Pulmonary veins) ফুসফুস থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ বিশুদ্ধ রক্ত হৃদযন্ত্রের বাম অলিন্দে বহন করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে সাধারণ রক্ত পরীক্ষা, ওষুধ ও তরল স্যালাইন প্রয়োগ (ইন্ট্রাভেনাস বা IV লাইন) এবং জরুরি পুষ্টি সরবরাহে শিরা প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ত্বকের উপরিভাগের ঠিক নিচেই পৃষ্ঠীয় শিরাগুলো দৃশ্যমান ও সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণত হাতের বাহু ও কবজির শিরাগুলো ভেনিপাংচারের (Venipuncture) জন্য নির্বাচন করা হয়।

শিরাতন্ত্রের শারীরবৃত্তীয় কার্যপদ্ধতি

হৃদযন্ত্রের বাম নিলয় থেকে উচ্চ চাপে ধমনির মাধ্যমে রক্ত বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছায়। ধমনিগুলো ক্রমান্বয়ে ক্ষুদ্র ধমনিকা এবং সেখান থেকে আণুবীক্ষণিক রক্ত কৈশিকনালিকায় (Capillaries) রূপান্তরিত হয়। সেখানে কোষের সাথে পুষ্টি ও গ্যাসীয় বিনিময় সম্পন্ন হওয়ার পর দূষিত রক্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপশিরা (Venules)-য় সংগৃহীত হয়। একাধিক উপশিরা একত্রিত হয়ে মাঝারি শিরা এবং মাঝারি শিরাগুলো মিলিত হয়ে পরিশেষে দুটি বৃহত্তম প্রধান শিরা—সুপিরিয়র ভেনাকাভা (ঊর্ধ্ব মহাশিরা) ও ইনফিরিয়র ভেনাকাভা (নিম্ন মহাশিরা)-র মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের ডান অলিন্দে (Right Atrium) প্রবেশ করে।

$$\text{কৈশিকজালিকা} \rightarrow \text{উপশিরা (Venule)} \rightarrow \text{মাঝারি শিরা} \rightarrow \text{মহাশিরা (Vena Cava)} \rightarrow \text{ডান অলিন্দ}$$

হৃদযন্ত্রের বাম নিলয়ে রক্তচাপ সর্বোচ্চ হলেও কৈশিকজালিকা পেরিয়ে শিরাতন্ত্রে প্রবেশের সময় এই চাপ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। ফলে হৃদযন্ত্রের ডান অলিন্দের শিথিলকরণ ও প্রসারণকালীন নিম্নচাপীয় শোষণ ক্ষমতা, সংলগ্ন কঙ্কাল পেশির সংকোচন (Skeletal muscle pump) এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের ফলে বক্ষগহ্বরের ঋণাত্মক চাপের যৌথ প্রভাবে রক্ত মধ্যাকর্ষণের বিপরীতে পুনরায় হৃৎপিণ্ডে উঠে আসে।

শিরার প্রাচীরের কলাস্থানিক গঠন (Histology)

শিরার প্রাচীর মূলত তিনটি স্তরে গঠিত, তবে একই ব্যাসের ধমনির তুলনায় এর প্রাচীর অনেক পাতলা এবং স্থিতিস্থাপক পেশিস্তরের পরিমাণ কম:

  • টিউনিকা এক্সটার্না বা অ্যাডভান্টিশিয়া (Tunica externa): বাইরের সবচেয়ে পুরু প্রতিরক্ষামূলক স্তর, যা শক্ত কোলাজেন ও ইলাস্টিক তন্তু দ্বারা গঠিত।
  • টিউনিকা মিডিয়া (Tunica media): মধ্যবর্তী পাতলা স্তর, যাতে মসৃণ পেশি ও ইলাস্টিন ফাইবার থাকে (ধমনির তুলনায় অনেক কম পুরু)।
  • টিউনিকা ইন্টিমা (Tunica intima): সবচেয়ে ভেতরের এন্ডোথেলিয়াম স্তর। রক্ত মাধ্যাকর্ষণের টানে নিচের দিকে ফিরে যাওয়া রোধ করতে অধিকাংশ মাঝারি ও দূরবর্তী শিরার ইন্টিমা ভাঁজ হয়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতির **দ্বিপত্রক কপাটিকা বা ভালভ** (Bicuspid valves) গঠন করে, যা রক্তকে কেবল হৃদযন্ত্রের দিকেই একমুখী প্রবাহিত হতে দেয়।

অবস্থানগত শ্রেণিবিভাগ

শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও ত্বকের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে শিরাগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:

  • ১. পৃষ্ঠীয় বা ত্বকীয় শিরা (Superficial veins): এগুলো ত্বকের নিচে সুপারফিসিয়াল ফাসিয়ায় অবস্থান করে এবং খালি চোখে নীলচে নালী হিসেবে স্পষ্ট দেখা যায় (যেমন: হাতের সেফালিক ও ব্যাসিলিক শিরা, পায়ের গ্রেট স্যাফেনাস শিরা)।
  • ২. গভীর শিরা (Deep veins): এগুলো পেশির গভীর আবরণী বা ডিপ ফাসিয়ার অভ্যন্তরে সংশ্লিষ্ট প্রধান ধমনিগুলোর সমান্তরালে জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে (যেমন: ফিমোরাল, পপলিটিয়াল ও ব্রাকিয়াল শিরা)।
  • ৩. পারফোরেটর বা সংযোগকারী শিরা (Perforator veins): এগুলো পেশির প্রাচীর ভেদ করে পৃষ্ঠীয় শিরার সাথে গভীর শিরার সংযোগ ঘটায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ভালভের নিয়ন্ত্রণে রক্ত কেবল পৃষ্ঠীয় শিরা থেকে গভীর শিরায় প্রবেশ করে।

মানবদেহের প্রধান প্রধান শিরাব্যবস্থা (Venous Systems)

১. সিস্টেমিক মহাশিরা ব্যবস্থা (Systemic Venous System)

  • ঊর্ধ্ব মহাশিরা (Superior Vena Cava): মাথা, ঘাড়, বাহু ও বক্ষগহ্বর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে।
    • ইন্টারনাল জুগুলার শিরা: মস্তিষ্ক ও করোটি থেকে দূষিত রক্ত নিষ্কাশন করে।
    • এক্সটারনাল জুগুলার শিরা: মুখমণ্ডল ও মাথার বহির্ভাগ থেকে রক্ত আনে।
    • সাবক্লেভিয়ান ও ব্রাকিওসেফালিক শিরা: হাত ও গ্রীবার শিরা একত্রিত করে ঊর্ধ্ব মহাশিরা গঠন করে।
  • নিম্ন মহাশিরা (Inferior Vena Cava): মধ্যচ্ছদার নিচের সমগ্র শরীর (উদর, শ্রোণী ও পা) থেকে রক্ত সংগ্রহকারী দেহের দীর্ঘতম শিরা।
    • বৃক্কীয় শিরা (Renal veins): কিডনি থেকে ফিল্টারকৃত রক্ত সংগ্রহ করে।
    • হেপাটিক শিরা (Hepatic veins): যকৃৎ থেকে রক্ত নিম্ন মহাশিরায় পাঠায়।
    • ইলিয়াক ও ফিমোরাল শিরা: শ্রোণী ও নিম্নঙ্গের সমস্ত রক্ত বহন করে।
    • টেস্টিকুলার / ওভারিয়ান শিরা ও ফ্রেনিক শিরা।

২. হেপাটিক পোর্টাল ব্যবস্থা (Hepatic Portal System)

পরিপাকতন্ত্র (পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র, অগ্ন্যাশয় ও প্লীহা) থেকে শোষিত পুষ্টি ও টক্সিনযুক্ত রক্ত সরাসরি মহাশিরার বদলে প্রথমে 'হেপাটিক পোর্টাল শিরা'-র মাধ্যমে যকৃতে (Liver) প্রবেশ করে। যকৃতে বিপাকীয় প্রক্রিয়াকরণ ও বিষমুক্তকরণের পর সেই রক্ত হেপাটিক শিরার মাধ্যমে নিম্ন মহাশিরার মূল সংবহনে মেশে:

  • স্প্লেনিক শিরা (Splenic vein)
  • সুপিরিয়র মেসেন্টেরিক শিরা (Superior mesenteric vein)
  • ইনফিরিয়র মেসেন্টেরিক শিরা (Inferior mesenteric vein)

৩. পালমোনারি বা ফুসফুসীয় শিরা ব্যবস্থা (Pulmonary System)

  • চারটি পালমোনারি শিরা ফুসফুসে অক্সিজেনযুক্ত হওয়া তাজা রক্ত বহন করে সরাসরি হৃদযন্ত্রের বাম অলিন্দে পৌঁছে দেয়।

ক্লিনিকাল গুরুত্ব ও রোগব্যাধি

  • ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (DVT): পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা, যা দীর্ঘক্ষণ অচল থাকলে ঘটে। এই ক্লট ছুটে গিয়ে ফুসফুসে আটকে গেলে প্রাণঘাতী 'পালমোনারি এমবোলিজম' সৃষ্টি করে।
  • ভ্যারিকোজ ভেইন (Varicose Veins): পায়ের শিরার কপাটিকা অকেজো হয়ে রক্ত নিচের দিকে জমে শিরাগুলো মোটা, আঁকাবাঁকা ও দৃশ্যমান হয়ে ফুলে ওঠা।
  • ক্রনিক ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সি (CVI): শিরার ভালভ দুর্বলতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে পায়ে রক্ত জমে শোথ (Edema) ও ভেনাস আলসার তৈরি হওয়া।
  • ফ্লেবাইটিস (Phlebitis): আইভি ক্যানুলা বা সংক্রমণের কারণে শিরার প্রাচীরে প্রদাহ সৃষ্টি হওয়া।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র


বহিঃসংযোগ

Template:Commons category