রক্ত (Blood / তরল যোজক কলা)

From LTRC
রক্ত (Blood)
শিরা ও ধমনির রক্ত
অক্সিজেনসমৃদ্ধ ধমনির রক্ত (উজ্জ্বল লাল) এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত শিরার রক্ত (গাঢ় লাল)
স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে রক্তকণিকা
ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দৃশ্যমান লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা
শারীরস্থানিক ও কলাস্থানিক বিবরণ
ল্যাটিন নাম: sanguis (গ্রিক: haema)
কলাবিদ্যা শ্রেণি: বিশেষায়িত তরল যোজক কলা
সংবহন ব্যবস্থা: রক্ত সংবহন তন্ত্র (কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম)
মোট পরিমাণ: মানবদেহে প্রায় ৫ থেকে ৫.৫ লিটার (শরীরের ওজনের প্রায় ৭–৮%)
পিএইচ (pH) মান: ৭.৩৫ – ৭.৪৫ (সামান্য ক্ষারীয়)
প্রধান উপাদান: রক্তরস বা প্লাজমা (৫৫%) ও রক্তকণিকাসমূহ (৪৫%)
উৎপত্তি স্থান: লাল অস্থিমজ্জা (হেমাটোপয়েসিস প্রক্রিয়ায়)

রক্ত (Template:Lang-en, Template:Lang-la, প্রাচীন গ্রিক: Template:Lang-el বা haema) হলো মানুষ ও অন্যান্য উচ্চতর মেরুদণ্ডী প্রাণীদের সংবহনতন্ত্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি বিশেষায়িত, লবণাক্ত, সান্দ্র এবং সামান্য ক্ষারীয় তরল যোজক কলা।[1] রক্ত মূলত হৃৎপিণ্ডের পাম্পিং ক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তনালী (ধমনি, শিরা ও কৈশিক জালিকা)-র মধ্য দিয়ে সমগ্র দেহে সঞ্চালিত হয়। এটি ফুসফুস থেকে দেহকোষে অক্সিজেন ($O_2$) এবং পরিপাকনালী থেকে শোষিত খাদ্যসার (গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড) পরিবহন করে। একই সাথে কোষীয় বিপাকের ফলে উৎপন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ (কার্বন ডাই-অক্সাইড, ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, ল্যাকটিক অ্যাসিড) নিষ্কাশনের জন্য ফুসফুস ও বৃক্কে বহন করে নিয়ে যায়। রক্ত সম্পর্কিত চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় ও জৈবিক গবেষণার শাখাকে হেমাটোলজি (Hematology) বলা হয়।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দেহে গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৫.৫ লিটার এবং নারীদের দেহে প্রায় ৩.৫ থেকে ৪.৫ লিটার রক্ত থাকে, যা মোট শারীরিক ওজনের প্রায় ৭% থেকে ৮%।[2]

রক্তের ভৌত ও রাসায়নিক উপাদানসমূহ

রক্তকে একটি টেস্টটিউবে নিয়ে সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রে ঘোরালে এটি প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়—হালকা হলুদ বর্ণের তরল অংশ যাকে রক্তরস বা প্লাজমা বলা হয় (প্রায় ৫৫%) এবং নিচের তলানিতে জমা হওয়া কোষীয় অংশ যাকে রক্তকণিকা বলা হয় (প্রায় ৪৫%)।[3]

১. রক্তরস বা প্লাজমা (Plasma - ৫৫%)

প্লাজমার প্রায় ৯০–৯২% অংশই পানি এবং বাকি ৮–১০% অংশে বিভিন্ন দ্রবীভূত জৈব ও অজৈব পদার্থ থাকে:

  • প্লাজমা প্রোটিন: প্রধান তিনটি প্লাজমা প্রোটিন হলো অ্যালবুমিন (রক্তের অসমোটিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করে), গ্লোবুলিন (অ্যান্টিবডি তৈরি করে অনাক্রম্যতা প্রদান করে) এবং ফাইব্রিনোজেন ও প্রোথ্রম্বিন (রক্ত তঞ্চনে সহায়তা করে)।
  • অজৈব উপাদান: সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্লোরাইড ও বাইকার্বোনেট আয়ন।
  • অন্যান্য দ্রব্যাদি: গ্লুকোজ, চর্বি, ভিটামিন, হরমোন, উৎসেচক এবং বিপাকীয় বর্জ্য (ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন)।

২. রক্তকণিকাসমূহ (Formed Elements / Blood Cells - ৪৫%)

মানবদেহের রক্তে প্রধানত তিন ধরনের কোষীয় উপাদান থাকে:[4]

  • লোহিত রক্তকণিকা বা এরিথ্রোসাইট (Red Blood Cells - RBC):
    • এগুলো দ্বি-অবতল (biconcave), নিউক্লিয়াসবিহীন (স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে) ও চাকতির মতো।
    • প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ (পুরুষে প্রায় ৫০–৫৫ লাখ, নারীতে ৪০–৪৫ লাখ) লোহিত কণিকা থাকে।[5]
    • এর ভেতরে লোহাযুক্ত প্রোটিন হিমোগ্লোবিন (Hemoglobin) থাকে, যা রক্তকে লাল বর্ণ প্রদান করে এবং অক্সিহিমোগ্লোবিন যৌগ হিসেবে ফুসফুস থেকে কোষে অক্সিজেন পরিবহন করে।
    • অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন হয় (Erythropoiesis) এবং এর গড় আয়ুষ্কাল প্রায় ১২০ দিন। মেয়াদ শেষে এগুলো প্লীহা ও যকৃতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
  • শ্বেত রক্তকণিকা বা লিউকোসাইট (White Blood Cells - WBC):
    • এগুলো বর্ণহীন, নিউক্লিয়াসযুক্ত এবং অনিয়মিত বা অ্যামিবয়েড আকৃতির।
    • প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে এদের সংখ্যা ৪,০০০ থেকে ১১,০০০।
    • এগুলো প্রধানত দুই প্রকার: দানাদার (নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল, বেসোফিল) এবং অদানাদার (লিম্ফোসাইট ও মনোসাইট)।
    • শ্বেতকণিকা ফ্যাগোসাইটোসিস ও অ্যান্টিবডি উৎপাদনের মাধ্যমে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এদের গড় আয়ু ১২ থেকে ১৫ দিন।
  • অণুচক্রিকা বা থ্রম্বোসাইট (Platelets):
    • এগুলো অস্থিমজ্জার মেগাক্যারিওসাইট কোষের ভাঙা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোল বা ডিম্বাকার টুকরো (নিউক্লিয়াসবিহীন)।
    • প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে এদের সংখ্যা প্রায় ১.৫ থেকে ৪ লাখ।
    • এদের প্রধান কাজ হলো ক্ষতস্থানে রক্ত জমাট বাঁধতে (রক্ত তঞ্চন বা Coagulation) সাহায্য করে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করা। এদের আয়ু ৭ থেকে ১০ দিন।

রক্ত তঞ্চন প্রক্রিয়া (Blood Clotting)

শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য অণুচক্রিকা ও প্লাজমা প্রোটিনের ধারাবাহিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় রক্ত জমাট বাঁধে: ১. ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী ও অণুচক্রিকা থেকে থ্রম্বোপ্লাস্টিন নিঃসৃত হয়। ২. থ্রম্বোপ্লাস্টিন ও ক্যালসিয়াম আয়ন ($Ca^{2+}$) রক্তরসের নিষ্ক্রিয় প্রোথ্রম্বিনকে সক্রিয় 'থ্রম্বিন'-এ রূপান্তরিত করে। ৩. থ্রম্বিন দ্রবণীয় 'ফাইব্রিনোজেন' প্রোটিনকে অদ্রবণীয় সুতার মতো 'ফাইব্রিন' পলিমারে পরিণত করে। ৪. ফাইব্রিন তন্তুগুলো জালিকার মতো বিন্যস্ত হয়ে রক্তকণিকাকে আটকে ফেলে একটি জমাট প্লাগ (Clot) তৈরি করে রক্তপাত বন্ধ করে।

রক্তের গ্রুপ (Blood Groups)

১. এবিও (ABO) রক্তের গ্রুপ

১৯০১ সালে অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টাইনার (Karl Landsteiner) লোহিত রক্তকণিকার ঝিল্লিতে থাকা বিশেষ অ্যান্টিজেন (A ও B) এবং রক্তরসে থাকা অ্যান্টিবডির (anti-A ও anti-B) উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রক্তকে চারটি প্রধান গ্রুপে ভাগ করেন:[6]

  • গ্রুপ A: লোহিত কণিকায় A অ্যান্টিজেন এবং প্লাজমায় anti-B অ্যান্টিবডি থাকে।
  • গ্রুপ B: লোহিত কণিকায় B অ্যান্টিজেন এবং প্লাজমায় anti-A অ্যান্টিবডি থাকে।
  • গ্রুপ AB: লোহিত কণিকায় A ও B উভয় অ্যান্টিজেন থাকে, কিন্তু প্লাজমায় কোনো অ্যান্টিবডি থাকে না (সার্বজনীন গ্রহীতা / Universal recipient)।
  • গ্রুপ O: লোহিত কণিকায় কোনো অ্যান্টিজেন থাকে না, কিন্তু প্লাজমায় anti-A ও anti-B উভয় অ্যান্টিবডি থাকে (সার্বজনীন দাতা / Universal donor)।

২. আরএইচ ফ্যাক্টর (Rh Factor)

১৯৪০ সালে ল্যান্ডস্টাইনার ও উইনার রেসাস বানরের রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এই অ্যান্টিজেন (RhD) আবিষ্কার করেন।[7] যাদের রক্তে এই অ্যান্টিজেন থাকে তারা Rh-পজিটিভ ($Rh^+$) এবং যাদের থাকে না তারা Rh-নেগেটিভ ($Rh^-$)। গর্ভাবস্থায় মা $Rh^-$ এবং গর্ভস্থ শিশু $Rh^+$ হলে দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে 'এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস' (Erythroblastosis fetalis) নামক মারাত্মক রক্তশূন্যতাজনিত রোগ হতে পারে।

রক্তের প্রধান শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি

  • শ্বসন গ্যাস পরিবহন: ফুসফুস থেকে কোষে অক্সিজেন পরিবহন এবং কোষীয় বিপাকে সৃষ্ট $CO_2$ ফুসফুসে বহন করা।
  • পুষ্টি সরবরাহ: ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে শোষিত গ্লুকোজ, ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যামিনো অ্যাসিড ও ভিটামিন দেহের কোষে পৌঁছে দেওয়া।
  • বর্জ্য অপসারণ: প্রোটিন বিপাকের ফলে সৃষ্ট ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড ও ক্রিয়েটিনিন নিষ্কাশনের জন্য রেচনতন্ত্রে (বৃক্কে) নিয়ে যাওয়া।
  • রোগ প্রতিরোধ ও অনাক্রম্যতা: শ্বেত রক্তকণিকার ফ্যাগোসাইটোসিস এবং লিম্ফোসাইট দ্বারা অ্যান্টিবডি তৈরি করে রোগজীবাণু ধ্বংস করা।
  • হরমোন ও উৎসেচক পরিবহন: অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ক্ষরিত হরমোন সরাসরি লক্ষ্য অঙ্গে পৌঁছে দেওয়া।
  • হোমিওস্ট্যাসিস ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: দেহের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তাপ বণ্টন করে শারীরিক তাপমাত্রা প্রায় ৩৭° সে (৯৮.৬° ফা) এবং বাফার সিস্টেমের মাধ্যমে রক্তরসের পিএইচ ৭.৪-এ স্থির রাখা।
  • রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ: অণুচক্রিকা ও জমাট বাঁধার ফ্যাক্টরগুলোর মাধ্যমে ক্ষতস্থানে রক্তপাত বন্ধ করা।

রক্ত সম্পর্কিত রোগব্যাধি (Pathology)

  • রক্তস্বল্পতা (Anemia): রক্তে হিমোগ্লোবিন বা লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা কমে যাওয়া (যেমন: আয়রনের ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া ও সিকেল সেল অ্যানিমিয়া)।
  • লিউকেমিয়া (Leukemia): অস্থিমজ্জায় অস্বাভাবিক ও অকার্যকর শ্বেত রক্তকণিকার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিজনিত রক্তের ক্যান্সার।
  • হিমোফিলিয়া (Hemophilia): জিনগত ত্রুটির কারণে রক্ত তঞ্চন ফ্যাক্টরের (ফ্যাক্টর VIII বা IX) অভাবে রক্ত জমাট না বাঁধার বংশগত ব্যাধি।
  • থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া (Thrombocytopenia): রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া (যেমন: ডেঙ্গু বা আইটিপিতে)।
  • সেপ্টিসেমিয়া বা রক্তে বিষক্রিয়া (Sepsis / Septicemia): রক্তপ্রবাহে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. ↑ Definition of BLOOD – Merriam-Webster Medical Dictionary, ২০১৭।
  2. ↑ Alberts, B. (2012). Table 22-1 Blood Cells. Molecular Biology of the Cell. NCBI Bookshelf.
  3. ↑ Composition of the Blood – SEER Training Modules, National Cancer Institute.
  4. ↑ Ganong, W. F. (2003). Review of Medical Physiology (21st ed.). McGraw-Hill, পৃ. ৫১৮। ISBN 978-0-07-121765-1.
  5. ↑ RBC count – MedlinePlus Medical Encyclopedia, ২০০৭।
  6. ↑ Maton, A., et al. (1993). Human Biology and Health. Prentice Hall. ISBN 978-0-13-981176-0.
  7. ↑ Landsteiner, K., & Wiener, A. S. (1940). An Agglutinable Factor in Human Blood Recognized by Immune Sera for Rhesus Blood. Exp Biol Med, 43(1), 223.