পরিবার

From LTRC

Template:Infobox

ফিলাডেলফিয়া ক্রোমোজোম (Philadelphia chromosome) হলো ক্রোমোজোমের একটি জিনগত ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা, যা মূলত 'ক্রনিক মাইলোসাইটিক লিউকেমিয়া' (Chronic Myelocytic Leukemia বা CML) নামক এক প্রকার ব্লাড ক্যান্সার বা রক্তের ক্যান্সার সৃষ্টি করে।

ইতিহাস ও জিনগত কারণ

১৯৬০ সালে পিটার নোয়েল (Peter Nowell) এবং ডেভিড হাঙ্গারফোর্ড (David Hungerford) নামক দুই বিজ্ঞানী ফিলাডেলফিয়া (Philadelphia) শহরে সর্বপ্রথম এই ক্রোমোজোমাল ত্রুটিটি আবিষ্কার করেন। আবিষ্কারের স্থানের নামানুসারেই একে 'ফিলাডেলফিয়া ক্রোমোজোম' বলা হয়। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী জ্যানেট রৌলি (Janet Rowley) ১৯৭৩ সালে এর সুনির্দিষ্ট ক্রোমোজোমাল গঠনটি আবিষ্কার করেন।

তিনি দেখান যে, ২২ নম্বর ক্রোমোজোমের দীর্ঘ বাহুর (long arm) একটি অংশ ভেঙে গিয়ে অন্য একটি ক্রোমোজোমের (সাধারণত ৯ নম্বর ক্রোমোজোম) সাথে যুক্ত হয়। অর্থাৎ ৯ এবং ২২ নম্বর ক্রোমোজোমের মধ্যে একটি অংশের আদান-প্রদান (Reciprocal translocation) ঘটে। এর ফলে ফিলাডেলফিয়া ক্রোমোজোমে (ছোট হয়ে যাওয়া ২২ নম্বর ক্রোমোজোম) BCR-ABL নামক একটি নতুন অস্বাভাবিক জিন বা ফিউশন জিনের সৃষ্টি হয়।

ক্রনিক মাইলোজেনাস লিউকেমিয়া (CML)

ক্রনিক মাইলোজেনাস লিউকেমিয়া (যাকে ক্রনিক গ্রানুলোসাইটিক লিউকেমিয়াও বলা হয়) হলো রক্ত এবং অস্থিমজ্জার (Bone marrow) একটি ধীর গতির ক্যান্সার। এটি সাধারণত মধ্যবয়সী বা বয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়, শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত বিরল। লিউকেমিয়া লোহিত রক্তকণিকা (RBC), শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) এবং অণুচক্রিকাকে (Platelets) প্রভাবিত করে।

সাধারণত অস্থিমজ্জায় থাকা স্টেম সেল বা অপরিণত কোষগুলো ধীরে ধীরে পরিণত রক্তকণিকায় রূপান্তরিত হয়। স্টেম সেল মাইলোয়েড বা লিম্ফয়েড স্টেম সেলে পরিণত হতে পারে। লিম্ফয়েড সেল শ্বেত রক্তকণিকায় পরিণত হয়। অন্যদিকে মাইলোয়েড স্টেম সেল তিন ধরণের কোষের যেকোনো একটিতে পরিণত হতে পারে:

  • লোহিত রক্তকণিকা, যা শরীরের টিস্যুতে অক্সিজেন সরবরাহ করে।
  • শ্বেত রক্তকণিকা, যা রোগ প্রতিরোধ করে।
  • অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট, যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।

CML-এ আক্রান্ত রোগীর অস্থিমজ্জায় ফিলাডেলফিয়া ক্রোমোজোমের কারণে অতিরিক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ শ্বেত রক্তকণিকা উৎপন্ন হয়।

লক্ষণসমূহ

ক্রনিক মাইলোজেনাস লিউকেমিয়ার সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • হঠাৎ ওজন হ্রাস
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করা
  • রাতে প্রচণ্ড ঘাম হওয়া
  • জ্বর
  • প্লীহা বড় হয়ে যাওয়ার কারণে পাঁজরের বাম দিকের নিচে ব্যথা অনুভব করা।

কখনো কখনো কোনো লক্ষণ ছাড়াই সাধারণ রুটিন পরীক্ষার সময় এই রোগ ধরা পড়তে পারে।[1]

চিকিৎসা

ফিলাডেলফিয়া ক্রোমোজোম পজিটিভ ক্রনিক মাইলোসাইটিক লিউকেমিয়া (CML)-এর চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, ইমিউনোথেরাপি, স্টেম সেল বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (Bone marrow transplant) এবং রেডিয়েশন থেরাপি ব্যবহার করা হয়। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা এবং রোগীকে উপশম দেওয়া।

তবে বর্তমানে CML-এর প্রধান এবং প্রমিত চিকিৎসা (Standard treatment) হলো 'টাইরোসিন কাইনেজ ইনহিবিটরস' (TKIs)। BCR-ABL ফিউশন জিনটি 'টাইরোসিন কাইনেজ' নামক এক ধরনের এনজাইম বা প্রোটিন তৈরি করে, যা ক্যান্সার কোষকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে সাহায্য করে। TKI ওষুধগুলো এই টাইরোসিন কাইনেজ এনজাইমের কাজকে বাধা দেয় এবং BCR-ABL জিনের প্রভাবে তৈরি হওয়া ক্যান্সার কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। কোষের এই প্রাকৃতিক মৃত্যু প্রক্রিয়াকে অ্যাপোপটোসিস (Apoptosis) বলা হয়।[2]

ভারতে CML চিকিৎসা

ভারতের মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ, চেন্নাই এবং নয়াদিল্লির মতো বড় শহরগুলোর হাসপাতালগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত মানের ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা সহজলভ্য। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সহায়তা এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সুবিধার কারণে ভারত বর্তমানে একটি অন্যতম প্রধান 'মেডিকেল ট্যুরিজম' বা চিকিৎসা পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অনকোলজি বা ক্যান্সার চিকিৎসার দিক থেকে ভারতের মান বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর সমকক্ষ।[3]