ধমনি / ধমনীতন্ত্র (Artery / Arterial System)
| ধমনি (Artery) | |
|---|---|
ধমনির প্রাচীরের তিনটি স্তর (ইন্টিমা, মিডিয়া ও অ্যাডভান্টিশিয়া) | |
![]() ধমনির অনুদৈর্ঘ্য ও প্রস্থচ্ছেদের বিবর্ধিত রূপ | |
| শারীরস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় বিবরণ | |
| ল্যাটিন নাম: | arteria (বহুবচনে: arteriae) |
| তন্ত্র: | সংবহনতন্ত্র (Circulatory system) |
| রক্তের ধরণ: | অক্সিজেনসমৃদ্ধ বিশুদ্ধ রক্ত (ব্যতিক্রম: ফুসফুসীয় ধমনি) |
| রক্তপ্রবাহের দিক: | হৃৎপিণ্ড থেকে দেহের দূরবর্তী অঙ্গ ও কলার দিকে |
| প্রাচীর ও গহ্বর: | পুরু, স্থিতিস্থাপক পেশিবহুল প্রাচীর এবং সংকীর্ণ লুমেন (কপাটিকাহীন) |
| রক্তচাপ ও প্রবাহ: | উচ্চ চাপযুক্ত ও স্পন্দনশীল (অলিন্দের ছন্দে তরঙ্গায়িত) |
ধমনি (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো মানবদেহ ও মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রক্ত সংবহনতন্ত্রের সেই সকল পুরু, পেশিবহুল ও স্থিতিস্থাপক রক্তনালী, যা উচ্চ চাপে হৃদযন্ত্র থেকে অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্ত দেহের সমস্ত অঙ্গ, কলা ও কোষে বহন করে নিয়ে যায়। ব্যতিক্রম হিসেবে ফুসফুসীয় ধমনি (Pulmonary artery) হৃদযন্ত্রের ডান নিলয় থেকে অক্সিজেনবিহীন দূষিত রক্ত পরিশোধনের জন্য ফুসফুসে নিয়ে যায়।
ধমনিগুলো শরীরের গভীরে সুরক্ষিত অবস্থায় অবস্থান করে। এদের প্রাচীর অত্যন্ত পুরু ও নমনীয় হওয়ায় এগুলো হৃদযন্ত্রের প্রতিটি পাম্পের উচ্চ রক্তচাপ সহ্য করতে পারে এবং স্পন্দনের তালে তালে রক্তকে তরঙ্গের মতো সামনের দিকে চালিত করে। ধমনিগুলো ক্রমান্বয়ে ক্ষুদ্রতর ধমনিকা (Arteriole) এবং সবশেষে অতিসূক্ষ্ম রক্ত কৈশিকজালিকা বা ক্যাপিলারিতে (Capillaries) বিভক্ত হয়ে দেহকোষে পুষ্টি ও গ্যাসীয় বিনিময় ঘটায়।
ধমনির প্রাচীরের কলাস্থানিক গঠন (Histology)
ধমনির প্রাচীর মূলত তিনটি সুসংগঠিত স্তরে গঠিত:
- টিউনিকা ইন্টিমা (Tunica intima / অন্তর্বস্ত্র): সবচেয়ে ভেতরের স্তর, যা একক স্তরের মসৃণ এন্ডোথেলিয়াল কোষ (Endothelium) এবং এর নিচে একটি পাতলা বেসমেন্ট মেমব্রেন ও অভ্যন্তরীণ ইলাস্টিক ল্যামিনা দ্বারা গঠিত। এটি রক্তের ঘর্ষণহীন মসৃণ প্রবাহ নিশ্চিত করে।
- টিউনিকা মিডিয়া (Tunica media / মধ্যবস্ত্র): মধ্যবর্তী সবচেয়ে পুরু ও শক্তিশালী স্তর, যা অনৈচ্ছিক মসৃণ পেশি (Smooth muscle cells) এবং স্থিতিস্থাপক কোলাজেন ও ইলাস্টিন ফাইবার দ্বারা গঠিত। সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের প্রভাবে এই স্তরটি সংকুচিত (Vasoconstriction) বা প্রসারিত (Vasodilation) হয়ে দেহের রক্তচাপ ও রক্তপ্রবাহের দিক নিয়ন্ত্রণ করে।
- টিউনিকা অ্যাডভান্টিশিয়া বা এক্সটার্না (Tunica adventitia / বহির্বস্ত্র): সবচেয়ে বাইরের প্রতিরক্ষামূলক স্তর, যা শক্ত সংযোগকারী কলা (Connective tissue), কোলাজেন তন্তু এবং ক্ষুদ্র রক্তনালী (Vasa vasorum)-সমৃদ্ধ, যা ধমনির নিজস্ব প্রাচীরকে পুষ্টি যোগায়।
ধমনি বনাম শিরার কাঠামোগত পার্থক্য
- প্রাচীরের পুরুত্ব: ধমনির প্রাচীর পুরু, পেশিবহুল ও স্থিতিস্থাপক; শিরার প্রাচীর তুলনামূলক পাতলা ও কম স্থিতিস্থাপক।
- অভ্যন্তরীণ গহ্বর (Lumen): ধমনির গহ্বর বা লুমেন সরু ও গোলাকার; শিরার লুমেন প্রশস্ত ও চ্যাপ্টা।
- কপাটিকা (Valves): ধমনিতে কোনো অভ্যন্তরীণ কপাটিকা বা ভালভ থাকে না (কারণ রক্তের উচ্চ চাপ নিজেই একমুখী প্রবাহ বজায় রাখে); শিরায় রক্তের বিপরীত প্রবাহ রোধে কপাটিকা থাকে।
- রক্তপ্রবাহের প্রকৃতি: ধমনিতে রক্ত দ্রুত, উচ্চ চাপে এবং তরঙ্গের মতো স্পন্দনে প্রবাহিত হয়; শিরায় রক্ত ধীরগতিতে ও স্থির চাপে প্রবাহিত হয়।
মানবদেহের প্রধান প্রধান ধমনীতন্ত্র (Arterial System)
১. মহাধমনির খিলান ও এর শাখাসমূহ (Aortic Arch)
বাম নিলয় থেকে উৎপন্ন মহাধমনি (Aorta) ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে নিচের প্রধান শাখাগুলো দেয়:
- করোনারি ধমনি (Coronary arteries): হৃদযন্ত্রের নিজস্ব পেশিতে বিশুদ্ধ রক্ত যোগায়।
- ব্রাকিওসেফালিক ট্রাঙ্ক (Brachiocephalic trunk): বিভক্ত হয়ে ডান সাবক্লেভিয়ান ও ডান কমন ক্যারোটিড ধমনি তৈরি করে।
- ক্যারোটিড ধমনি (Carotid arteries):
- এক্সটারনাল ক্যারোটিড ধমনি: মুখমণ্ডল, থাইরয়েড ও মাথার ত্বকে রক্ত দেয়।
- ইন্টারনাল ক্যারোটিড ধমনি: করোটির ভেতরে প্রবেশ করে মস্তিষ্কের অগ্রভাগ ও চোখে রক্ত সরবরাহ করে।
- সাবক্লেভিয়ান ধমনি (Subclavian artery):
- ভার্টিব্রাল ধমনি (Vertebral artery): মস্তিষ্কের পেছনের অংশে এবং ব্রেনস্টেম-লঘুমস্তিষ্কে রক্ত যোগায়।
- ইন্টারনাল ম্যামারি ধমনি (Internal mammary artery): বুকের খাঁচা ও স্তন অঞ্চলে রক্ত সরবরাহ করে (বাইপাস সার্জারিতে গ্রাফট হিসেবে বহুল ব্যবহৃত)।
- ব্রাকিয়াল ধমনি (Brachial artery): বাহু ও হাতের প্রধান রক্ত সরবরাহকারী ধমনি।
২. নিম্নগামী ও উদরীয় মহাধমনি (Descending & Abdominal Aorta)
বক্ষ ও উদর গহ্বরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গে রক্ত পাঠায়:
- ইন্টারকোস্টাল ধমনি (Intercostal arteries): পাঁজরের মধ্যবর্তী পেশিসমূহে রক্ত যোগায়।
- ফ্রেনিক ধমনি (Phrenic arteries): মধ্যচ্ছদা বা ডায়াফ্রামে রক্ত সরবরাহ করে।
- সিলিয়াক ট্রাঙ্ক (Celiac artery): পাকস্থলী, যকৃৎ ও প্লীহায় রক্ত সরবরাহকারী শাখা।
- সুপিরিয়র ও ইনফিরিয়র মেসেন্টেরিক ধমনি: ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্রে রক্ত সরবরাহ করে।
- রেনাল ধমনি (Renal arteries): বৃক্কে (কিডনি) রক্ত পরিশোধনের জন্য রক্ত সরবরাহ করে।
- গোনাডাল ধমনি (Gonadal arteries): শুক্রাশয় (টেস্টিকুলার) বা ডিম্বাশয়ে (ওভারিয়ান) রক্ত সরবরাহ করে।
- লাম্বার ধমনি (Lumbar arteries): মেরুদণ্ড ও পিঠের পেশিতে রক্ত যোগায়।
- কমন ইলিয়াক ধমনি (Common iliac arteries): উদরের নিচে মহাধমনি দ্বিখণ্ডিত হয়ে এটি গঠন করে:
- ইন্টারনাল ইলিয়াক ধমনি: শ্রোণী গহ্বরের অঙ্গসমূহ (মূত্রথলি, জরায়ু ইত্যাদি)-এ রক্ত যোগায়।
- এক্সটারনাল ইলিয়াক ও ফিমোরাল ধমনি: ঊরু, হাঁটু এবং পায়ের দূরবর্তী প্রান্তে রক্ত সঞ্চালন করে (প্রান্তীয় ধমনীতন্ত্র)।
৩. ফুসফুসীয় ধমনীতন্ত্র (Pulmonary Circulation)
- পালমোনারি ধমনি (Pulmonary arteries): ডান নিলয় থেকে অক্সিজেনবিহীন দূষিত রক্ত ডান ও বাম ফুসফুসের অ্যালভিওলাইয়ে গ্যাসীয় বিনিময়ের জন্য নিয়ে যায়।
ক্লিনিকাল গুরুত্ব ও রোগব্যাধি
- অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis): ধমনির অভ্যন্তরীণ দেয়ালে কোলেস্টেরল জমে প্লাক তৈরি হওয়া এবং রক্তনালী শক্ত ও সরু হয়ে যাওয়া।
- মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন ও স্ট্রোক: করোনারি বা ক্যারোটিড ধমনি অবরুদ্ধ হয়ে হৃদপেশি বা মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস হওয়া।
- অ্যানিউরিজম (Aneurysm): উচ্চ রক্তচাপ বা দুর্বলতার কারণে ধমনির প্রাচীর বেলুনের মতো ফুলে ওঠা (যেমন অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম)।
- প্রান্তীয় ধমনি ব্যাধি (PAD): হাত ও পায়ের ধমনি সংকুচিত হয়ে পায়ে তীব্র ব্যথা ও নিরাময়হীন ক্ষত সৃষ্টি।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র

