অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস / ধমনিপ্রাচীর কাঠিন্য (Atherosclerosis)
| অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis) | |
|---|---|
এন্ডোথেলিয়াল ত্রুটি থেকে শুরু করে ধমনিতে প্লাক গঠন ও রক্তনালী সংকীর্ণ হওয়ার সময়ানুক্রমিক চিত্র | |
ধমনির গহ্বরে কোলেস্টেরল ও ফোম কোষের সঞ্চয় | |
| চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় বিবরণ | |
| চিকিৎসা ক্ষেত্র: | হৃদরোগবিজ্ঞান (Cardiology), ভাসকুলার মেডিসিন |
| অন্য নাম: | ধমনিপ্রাচীর কাঠিন্য, আর্টারিওস্ক্লেরোটিক ভাসকুলার ডিজিজ (ASVD) |
| প্যাথলজিক্যাল গঠন: | অ্যাথেরোস্ক্লেরোটিক প্লাক বা অ্যাথেরোমা (লিপিড কোর, ফোম সেল ও ফাইব্রাস ক্যাপ) |
| প্রধান জটিলতা: | হার্ট অ্যাটাক, ইসকেমিক স্ট্রোক, প্রান্তীয় ধমনি ব্যাধি (PAD), অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম, মেসেন্টেরিক ইসকেমিয়া |
| প্রধান ঝুঁকির কারণ: | ডিসলিপিডেমিয়া (উচ্চ এলডিএল কোলেস্টেরল), ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বার্ধক্য, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা |
| রোগ নির্ণয়: | লিপিড প্রোফাইল, ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি ক্যালসিয়াম স্কোরিং, করোনারি/ভাসকুলার অ্যানজিওগ্রাফি |
| চিকিৎসা ও প্রতিরোধ: | জীবনযাত্রার পরিবর্তন, স্ট্যাটিন ওষুধ, অ্যান্টিপ্লাটিলেট (অ্যাসপিরিন), রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, এনজিওপ্লাস্টি ও ভাসকুলার সার্জারি |
অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (Template:Lang-en, প্রাচীন গ্রিক: Template:Lang-el বা athḗra [অর্থ: মণ্ড বা চর্বিযুক্ত পিণ্ড] এবং Template:Lang-el বা sklērós [অর্থ: শক্ত বা কঠিন]) হলো মাঝারি ও বৃহৎ ধমনিগুলোর একটি দীর্ঘমেয়াদী, প্রগতিশীল ও প্রদাহজনক সংবহন ব্যাধি। এই প্রক্রিয়ায় ধমনির অভ্যন্তরীণ প্রাচীরের নিচে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, লিপিড, ক্যালসিয়াম, ফোম কোষ এবং কোষীয় বর্জ্য পদার্থ ক্রমান্বয়ে জমা হয়ে শক্ত চর্বিচাকতি বা অ্যাথেরোস্ক্লেরোটিক প্লাক (Plaque) গঠন করে।[1] এর ফলে রক্তনালীর স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে যায় এবং অভ্যন্তরীণ লুমেন সংকুচিত হয়ে সংশ্লিষ্ট অঙ্গসমূহে রক্ত ও অক্সিজেনের স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হয়।[2]
অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস আধুনিক বিশ্বে মানব মৃত্যুর প্রধানতম মৌলিক কারণ। এটি হৃদযন্ত্রের করোনারি ধমনিতে ঘটলে হার্ট অ্যাটাক, মস্তিষ্কের ক্যারোটিড ও সেরিব্রাল ধমনিতে ঘটলে স্ট্রোক, পায়ের ধমনিতে ঘটলে প্রান্তীয় ধমনি ব্যাধি (PAD), অন্ত্রের ধমনিতে ঘটলে মেসেন্টেরিক ইসকেমিয়া এবং বৃক্কীয় ধমনিতে ঘটলে কিডনি বৈকল্য সৃষ্টি করে।[3] সাধারণত ৪৫ থেকে ৮৫ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর পেছনে এটি একক বৃহত্তম কারণ হিসেবে ক্রিয়াশীল।
রোগ সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ও প্যাথোজেনেসিস (Pathogenesis)
ধমনির স্বাভাবিক প্রাচীর তিনটি স্তরে গঠিত: বহিস্থ টিউনিকা অ্যাডভান্টিশিয়া, মধ্যবর্তী পেশিবহুল টিউনিকা মিডিয়া এবং অভ্যন্তরীণ একক স্তরের এন্ডোথেলিয়ামযুক্ত টিউনিকা ইন্টিমা। অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের বিকাশ একটি ধীরগতিসম্পন্ন জটিল বহুমুখী প্রক্রিয়া:[4]
- এন্ডোথেলিয়াল আঘাত ও ক্ষয় (Endothelial Dysfunction): ধূমপানের বিষাক্ত রাসায়নিক, উচ্চ রক্তচাপের ঘর্ষণজনিত চাপ, অনিয়ন্ত্রিত গ্লুকোজ বা উচ্চ কোলেস্টেরলের কারণে ধমনির সবচেয়ে ভেতরের এন্ডোথেলিয়াম স্তরে সূক্ষ্ম ক্ষত তৈরি হয়।
- লিপিড অনুপ্রবেশ ও জারণ (Lipid Infiltration & Oxidation): ক্ষতিগ্রস্ত স্থান দিয়ে রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল টিউনিকা ইন্টিমা স্তরে প্রবেশ করে এবং রাসায়নিকভাবে জারিত (Oxidized LDL) হয়ে তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি করে।
- ফোম কোষ ও ফ্যাটি স্ট্রিক গঠন (Foam Cells & Fatty Streaks): প্রদাহ সাড়া দিয়ে রক্তের মনোসাইট শ্বেত রক্তকণিকা ইন্টিমায় প্রবেশ করে ম্যাক্রোফেজে রূপান্তরিত হয়। এই ম্যাক্রোফেজগুলো অতিরিক্ত জারিত কোলেস্টেরল গ্রাস করে ফুলতে থাকে এবং 'ফোম কোষে' (Foam cells) পরিণত হয়। ফোম কোষগুলোর পুঞ্জীভূত রূপই হলো অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের প্রাথমিক রূপ—যাকে "ফ্যাটি স্ট্রিক" (Fatty streak) বলা হয়।
- ফাইব্রাস প্লাক ও ক্যালসিফিকেশন: ফোম কোষগুলো ফেটে গিয়ে ভেতরে লিপিড কোর তৈরি করে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে টিউনিকা মিডিয়ার মসৃণ পেশিকোষগুলো ইন্টিমায় স্থানান্তরিত হয়ে কোলাজেন ও ইলাস্টিন নিঃসরণ করে প্লাকের ওপর একটি শক্ত ফাইব্রাস আবরণ বা ক্যাপ (Fibrous cap) তৈরি করে। সাথে সাথে ক্যালসিয়াম জমে প্লাকটি শক্ত ও অনমনীয় হয়ে ওঠে।
- গ্ল্যাগভ ফেনোমেনন ও রক্তনালী সংকীর্ণতা: প্রাথমিক অবস্থায় ধমনি বাইরের দিকে প্রসারিত হয়ে রক্ত চলাচলের পথ অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করে (Glagov compensatory remodeling)। কিন্তু প্লাকটি ধমনির লুমেনের ৪০% থেকে ৭০% বা তার বেশি স্থান দখল করলে রক্তপ্রবাহ সরাসরি হ্রাস পায়।
- প্লাক ফেটে যাওয়া ও থ্রম্বোসিস (Plaque Rupture & Thrombosis): ভঙ্গুর বা পাতলা ক্যাপযুক্ত প্লাক হঠাৎ ফেটে গেলে ভেতরের চর্বি রক্তের প্লাটিলেটের সংস্পর্শে আসে। সাথে সাথে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধে (Thrombus), যা আকস্মিকভাবে রক্তনালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে তীব্র হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঘটায়।
প্রধান কারণ ও ঝুঁকির নিয়ামকসমূহ
অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস সৃষ্টির পেছনে পরিবর্তনযোগ্য ও অপরিবর্তনযোগ্য বহু উপাদান প্রভাব ফেলে:[5]
- ডিসলিপিডেমিয়া: রক্তে উচ্চমাত্রার এলডিএল (ক্ষতিকর কোলেস্টেরল) ও ট্রাইগ্লিসারাইড এবং নিম্নমাত্রার এইচডিএল (< ৪০ মিগ্রা/ডেলি)।
- উচ্চ রক্তচাপ: ধমনি প্রাচীরের ওপর অবিরাম অতিরিক্ত চাপ এন্ডোথেলিয়ামকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- ধূমপান ও তামাক সেবন: তামাকের নিকোটিন ও কার্বন মনোক্সাইড সরাসরি রক্তনালীর ভেতরের স্তর পুড়িয়ে দেয় এবং প্লাক গঠনের গতি বহুগুণ ত্বরান্বিত করে।
- ডায়াবেটিস মেলিটাস: অতিরিক্ত রক্তে গ্লুকোজ প্লাক গঠনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এবং রক্তনালীতে প্রদাহ বৃদ্ধি করে।
- বার্ধক্য ও লিঙ্গ: সাধারণত পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪৫ বছর এবং নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর (৫৫ বছর) এর ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
- দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ: রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, সোরিয়াসিস বা সিস্টেমিক লুপাসের মতো প্রদাহজনক ব্যাধি।
- স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, প্রক্রিয়াজাত লবণ ও স্যাচুরেটেড চর্বিবহুল খাদ্যাভ্যাস এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ।
ক্লিনিকাল রূপ ও অঙ্গভিত্তিক জটিলতা
যে ধমনিতে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস সৃষ্টি হয়, তার ওপর ভিত্তি করে ক্লিনিকাল লক্ষণ প্রকাশ পায়:
- হৃদযন্ত্রে (করোনারি ধমনি ব্যাধি): বুকে নিষ্পেষণমূলক ব্যথা বা অ্যানজাইনা, শ্বাসকষ্ট এবং মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক।
- মস্তিষ্কে (ক্যারোটিড ও সেরিব্রাল রোগ): একপাশের অঙ্গ অবশ হওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তি হারানো, কথা জড়িয়ে যাওয়া এবং ক্ষণস্থায়ী ইসকেমিক আক্রমণ (TIA) বা স্থায়ী স্ট্রোক।
- হাত ও পায়ে (প্রান্তীয় ধমনি ব্যাধি): কিছুটা পথ হাঁটলে পায়ের কাফ পেশিতে তীব্র খিল ধরা (Intermittent claudication), বিশ্রামে পায়ে তীব্র ব্যথা, পা ঠান্ডা হওয়া ও অঙ্গে পচন বা গ্যাংগ্রিন।
- অন্ত্রে (মেসেন্টেরিক ইসকেমিয়া): খাওয়ার পরপরই পেটে তীব্র ব্যথা এবং অন্ত্রের কোষ ধ্বংস হওয়া।
- বৃক্কে (রেনাল আর্টারি স্টেনোসিস): অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি অকার্যকারিতা।
- অ্যানিউরিজম (Aneurysm): ধমনির দেয়াল দুর্বল হয়ে বেলুনের মতো ফুলে ফেটে যাওয়া (যেমন উদরীয় মহাধমনির অ্যানিউরিজম)।
প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা
১. জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ
- খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: খাবারে অতিরিক্ত লবণ সীমিত রাখা (রক্তচাপ < ১৩০/৮০ মিমি পারদ বজায় রাখতে), প্রাণিজ চর্বি ও ট্রান্স-ফ্যাট বর্জন করে ফলমূল, শাকসবজি ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ।[6]
- ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বর্জন: অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।[7]
- ওজন নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম: দৈনিক অন্তত ৩০–৪০ মিনিট মাঝারি শরীরচর্চা বা দ্রুত হাঁটা।
- পর্যাপ্ত ঘুম (৭–৮ ঘণ্টা) এবং মানসিক চাপ হ্রাস করা।
২. ঔষধভিত্তিক চিকিৎসা
- স্ট্যাটিন থেরাপি (Statins): অ্যাটরভাস্ট্যাটিন বা রোসুভাস্ট্যাটিন—যা রক্তের এলডিএল কোলেস্টেরল কমায় এবং প্লাকের ফাইব্রাস ক্যাপ শক্ত করে প্লাক ফেটে যাওয়া রোধ করে।[8]
- অ্যান্টিপ্লাটিলেট ওষুধ: প্লাকের মুখে রক্ত জমাট বাঁধা রোধে অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেল।
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এসিই ইনহিবিটর, এআরবি এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মেটাবলিক ওষুধ।
৩. শল্যচিকিৎসা ও ইন্টারভেনশন
গুরুতর রক্তনালী ব্লকেজের ক্ষেত্রে:
- অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি ও স্টেন্টিং (Angioplasty & Stenting): বেলুন দিয়ে সংকুচিত রক্তনালী প্রসারিত করে সেখানে ধাতব বা ওষুধযুক্ত কৃত্রিম স্টেন্ট স্থাপন।
- এন্ডারটেরেক্টমি (Endarterectomy): অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ধমনি কেটে ভেতরের শক্ত প্লাক সরাসরি চেঁচে ফেলে দেওয়া (যেমন ক্যারোটিড এন্ডারটেরেক্টমি)।
- ভাসকুলার বাইপাস সার্জারি: শরীরের অন্য প্রান্তের সুস্থ রক্তনালী দিয়ে বিকল্প বাইপাস পথ তৈরি করা (যেমন CABG বা ফিমোরো-পপলিটিয়াল বাইপাস)।
আরও দেখুন
- ধমনি
- করোনারি ধমনি ব্যাধি
- ক্যারোটিড ধমনি
- মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন
- মস্তিষ্কাঘাত
- প্রান্তীয় ধমনি ব্যাধি
- রক্ত সংবহনতন্ত্র
তথ্যসূত্র
- ↑ Arteriosclerosis / atherosclerosis - Symptoms and causes – Mayo Clinic, ২০২৩।
- ↑ Atherosclerosis - Symptoms – NHLBI, NIH, ২০২২।
- ↑ Achanta, S., et al. (2023). *The Washington Manual of Medical Therapeutics*. Wolters Kluwer, পৃ. ৯৮, ১১৩, ১২৬, ৯৭৩। ISBN 978-1-975190-62-0.
- ↑ Glagov, S., et al. (1987). Compensatory Enlargement of Human Atherosclerotic Coronary Arteries. *New England Journal of Medicine*, 316(22), 1371–1375.
- ↑ Atherosclerosis - Causes and Risk Factors – NHLBI, NIH, ২০২২।
- ↑ Your Guide to Lowering Cholesterol With Therapeutic Lifestyle Changes (TLC) – NHLBI, NIH, ২০০৫।
- ↑ Atherosclerosis - Prevention – NHLBI, NIH, ২০২২।
- ↑ Taylor, F., et al. (2013). Statins for the primary prevention of cardiovascular disease. *Cochrane Database of Systematic Reviews*, (1), CD004816. PMID 23440795.
