মেলেনা (Melena / আলকাতরার মতো কালো পায়খানা)
মেলেনা (Template:Lang-en বা Template:Lang-en) হলো মানবদেহের একটি গুরুতর চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় লক্ষণ, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আলকাতরার মতো ঘন, আঠালো, চকচকে কালো এবং তীব্র কটু দুর্গন্ধযুক্ত মলত্যাগ।[1] এটি মূলত ঊর্ধ্ব পরিপাকতন্ত্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রক্তক্ষরণের (Upper Gastrointestinal Bleeding) সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। পাকস্থলী বা ডুওডেনাম থেকে নির্গত রক্ত যখন ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্র অতিক্রম করে, তখন রক্তের হিমোগ্লোবিন পরিপাকনালীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, পরিপাককারী উৎসেচক এবং অন্ত্রীয় ব্যাকটেরিয়ার রাসায়নিক ক্রিয়ায় জারিত হয়ে কালচে রঙের 'হেমাটিন' (Hematin)-এ রূপান্তরিত হয়। এর ফলেই মলে এই চারিত্রিক কালো বর্ণ ও দুর্গন্ধ তৈরি হয়।
'মেলেনা' শব্দটি ১৯শ শতাব্দীর শুরুতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রচলিত হয়, যা গ্রিক শব্দ μέλαινα (melaina - যার অর্থ কালো বা অন্ধকার) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এটি পরিপাকতন্ত্রের তীব্র রক্তপাতের নির্দেশক হওয়ায় এটিকে একটি জরুরি স্বাস্থ্যগত সংকট (Medical emergency) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মেলেনা ও হেমাটোকেজিয়ার মধ্যে পার্থক্য
পরিপাকতন্ত্রের রক্তক্ষরণের অবস্থান ও অন্ত্রের মধ্য দিয়ে পরিভ্রমণের সময়ের ওপর ভিত্তি করে মলের রঙের পার্থক্য ঘটে:[2]
- মেলেনা (Melena): রক্তক্ষরণের উৎস সাধারণত ট্রেইটসের লিগামেন্ট (Ligament of Treitz)-এর ওপরে—যেমন খাদ্যনালী, পাকস্থলী বা ডুওডেনামে অবস্থিত হয়। রক্ত পরিপাকনালীর ভেতরে প্রায় ১৪ ঘণ্টার বেশি সময় অবস্থান করায় তা ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান ও অ্যাসিডে পরিবর্তিত হয়ে কালো রঙ ধারণ করে।
- হেমাটোকেজিয়া (Hematochezia): সাধারণত নিম্ন পরিপাকতন্ত্র (কোলন, মলাশয় বা পায়ুপথ) থেকে রক্তপাত হলে তা অপরিবর্তিত থাকে এবং মলত্যাগের সময় তাজা ও উজ্জ্বল লাল রক্ত বের হয়। তবে ঊর্ধ্ব পরিপাকতন্ত্রে অতি দ্রুত ও ব্যাপক মাত্রায় রক্তপাত (১ লিটারের বেশি) হলে সময় না পাওয়ার কারণেও হেমাটোকেজিয়া দেখা দিতে পারে।
প্রধান কারণসমূহ
১. সাধারণ ও ক্লিনিকাল কারণসমূহ
- পেপটিক আলসার রোগ (Peptic Ulcer Disease): মেলেনার সর্বাধিক পরিচিত কারণ (প্রায় ৫০% ক্ষেত্রে)। হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (H. pylori) সংক্রমণ বা ব্যথানাশক এনএসএআইডি (NSAIDs) ওষুধের ব্যবহারের ফলে পাকস্থলী বা ডুওডেনামে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে রক্তপাত ঘটে।[3]
- খাদ্যনালীর ভ্যারিক্স (Esophageal Varices): যকৃতের সিরোসিসের কারণে পোর্টাল শিরায় উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হলে খাদ্যনালীর নিচের অংশের শিরাগুলো ফুলে ফেটে গিয়ে তীব্র রক্তক্ষরণ ঘটায়।
- ম্যালোরি-উইস সিন্ড্রোম (Mallory-Weiss Tear): তীব্র বমি বা হেঁচকির চাপে খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলের শ্লেষ্মাঝিল্লি ছিঁড়ে রক্তপাত।
- পাকস্থলীর ক্যান্সার ও ম্যালিগন্যান্ট টিউমার: গ্যাস্ট্রিক অ্যাডেনোকার্সিনোমা বা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল স্ট্রোমাল টিউমার (GIST)।
- অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট ও রক্তক্ষরণজনিত রোগ: ওয়ারফারিন, হেপারিন বা অ্যাসপিরিন জাতীয় রক্ত পাতলাকারী ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, হিমোফিলিয়া এবং থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া।
- মেকেলস ডাইভার্টিকুলাম ও রক্তনালীর বিকৃতি: ডিউলাফয় লিশন বা আর্টেরিওভেনাস ম্যালফরমেশন।
২. কৃত্রিম বা ছদ্ম-মেলেনা (Pseudo-melena)
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ ও খাদ্যের কারণেও মল কালো হতে পারে, তবে তা প্রকৃত মেলেনা নয় (এতে রক্তের উপস্থিতি বা তীব্র দুর্গন্ধ থাকে না):[4]
- আয়রন ট্যাবলেট বা লোহাযুক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ।
- বিসমাথ সাবস্যালিসাইলেট (পেপ্টো-বিসমল) সেবন।
- প্রচুর পরিমাণে বিটরুট, ব্ল্যাকবেরি, ব্লুবেরি বা কালো লিকারিস (যষ্টিমধু) খাওয়া।
- নাক দিয়ে রক্ত পড়ার (Epistaxis) পর অসাবধানতাবশত রক্ত গিলে ফেলা।
রোগ নির্ণয় পদ্ধতি
রোগীর শারীরিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করার পাশাপাশি রক্তক্ষরণের মূল উৎস শনাক্তকরণ অত্যন্ত জরুরি: ১. আপার জিআই এন্ডোস্কোপি (Upper GI Endoscopy): মেলেনা শনাক্তকরণের প্রধান ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্বর্ণমান পরীক্ষা। মুখ দিয়ে ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে খাদ্যনালী, পাকস্থলী ও ডুওডেনামের ক্ষত সরাসরি দেখা হয় এবং তাৎক্ষণিক রক্তপাত বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২. রক্ত পরীক্ষা: সিবিসি (হিমোগ্লোবিন ও হেমাটোক্রিট মাত্রা কমে যাওয়া), প্লাটিলেট কাউন্ট, কোয়াগুলেশন প্রোফাইল (PT/INR) এবং রক্তে ইউরিয়া/ক্রিয়েটিনিনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পর্যালোচনা। ৩. কোলোনোস্কোপি ও নিউক্লিয়ার স্ক্যান: এন্ডোস্কোপিতে উৎস না পাওয়া গেলে নিম্ন পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষার জন্য কোলোনোস্কোপি অথবা ধীরগতির রক্তপাত (< ০.৫ মিলি/মিনিট) শনাক্ত করতে রেড ব্লাড সেল (RBC) নিউক্লিয়ার স্ক্যান করা হয়।[5] ৪. মেসেন্টেরিক অ্যানজিওগ্রাফি: দ্রুত রক্তপাতের ক্ষেত্রে রক্তনালীর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয়।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
১. জরুরি পুনরুজ্জীবন (Emergency Resuscitation)
- রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে তাৎক্ষণিক আইসোলেটেড শিরায় ক্যানুলা স্থাপন।
- রক্তচাপ ও রক্তের আয়তন বজায় রাখতে দ্রুত আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন) এবং তীব্র রক্তক্ষরণের ক্ষেত্রে ক্রস-ম্যাচিং সাপেক্ষে রক্ত সঞ্চালন (Blood Transfusion)।
২. ঔষধভিত্তিক চিকিৎসা
- উচ্চমাত্রার প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (PPI): আইভি ওমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল বা এসোমিপ্রাজল ইনজেকশন পাকস্থলীর অ্যাসিড উৎপাদন প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে আলসারের ওপর রক্তের জমাট অক্ষুণ্ণ রাখে।
- ভাসোঅ্যাক্টিভ ড্রাগস: ভ্যারিসিয়াল রক্তক্ষরণে অক্ট্রিওটাইড (Octreotide) বা টেরলিপপ্রেসিন প্রয়োগ করে পোর্টাল শিরার রক্তচাপ কমানো হয়।
- রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়ক অ্যান্টি-ফাইব্রিনোলাইটিক ওষুধ প্রয়োগ।
৩. এন্ডোস্কোপিক ও সার্জিক্যাল চিকিৎসা
- এন্ডোস্কোপিক ভ্যারিসিয়াল লাইগেশন (EVL): খাদ্যনালীর ফোলা শিরায় রিং বা ব্যান্ড পরিয়ে রক্তপাত বন্ধ করা।
- এন্ডোস্কোপিক হেমোক্লিপিং ও থার্মাল কোয়াগুলেশন: রক্তক্ষরণকারী আলসারের মুখে ধাতব ক্লিপ বা তাপরশ্মি (APC) প্রয়োগ।
- ওষুধ ও এন্ডোস্কোপিতে রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ না হলে টিপস (TIPS) বা শল্যচিকিৎসার (Surgery) মাধ্যমে ক্ষতস্থান অপসারণ করা হয়।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ Walker, B. R., et al. (2014). Davidson's Principles and Practice of Medicine (22nd ed.). Churchill Livingstone, পৃ. ৮৫৪। ISBN 978-0-7020-5103-6.
- ↑ Talley, N. J., & O'Connor, S. (2014). Clinical Examination: A Systematic Guide To Physical Diagnosis (7th ed.). Churchill Livingstone. ISBN 9780729541473.
- ↑ Walker, H. K., Hall, W. D., & Hurst, J. W. (1990). Hematemesis, Melena, and Hematochezia. Clinical Methods: The History, Physical, and Laboratory Examinations. Butterworths. ISBN 9780409900774.
- ↑ Bloody or tarry stools – MedlinePlus, National Institutes of Health, ২০০৯।
- ↑ Eastwood, G. L. (2010). Gastrointestinal Bleeding. Decision Making in Medicine (3rd ed.). Mosby Elsevier, পৃ. ১৯৬–১৯৯। ISBN 978-0-323-04107-2.
