পরিপাক নালী / গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্ট (Gastrointestinal Tract / GI Tract)
| পরিপাক নালী (GI Tract) | |
|---|---|
মানবদেহের পরিপাক নালীর প্রধান অঙ্গসমূহ (পাকস্থলী, কোলন ও মলাশয়) | |
| শারীরস্থানিক বিবরণ | |
| ল্যাটিন নাম: | canalis alimentarius |
| তন্ত্র: | পরিপাকতন্ত্র (Digestive system) |
| প্রবেশ ও নির্গমন পথ: | মুখগহ্বর (প্রবেশদ্বার) ও পায়ুপথ (নির্গমনদ্বার) |
| দৈর্ঘ্য: | একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে প্রায় ৯ মিটার (৩০ ফুট) |
| প্রধান অংশসমূহ: | মুখগহ্বর, গলবিল, অন্ননালী, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র ও পায়ু |
| প্রধান কাজ: | খাদ্য গ্রহণ, যান্ত্রিক ও রাসায়নিক পরিপাক, পুষ্টি ও পানি শোষণ, বর্জ্য নিষ্কাশন |
পরিপাক নালী (Template:Lang-en বা Template:Lang-en, সংক্ষেপে GI tract) হলো মানুষ ও দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম উচ্চতর প্রাণীদের দেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি অবিচ্ছিন্ন পেশিবহুল ফাঁপা নালী বা পথ, যা খাদ্য গ্রহণ, খাদ্যের জটিল উপাদানসমূহ ভেঙে সহজ-সরল পুষ্টি উপাদানে রূপান্তর ও শোষণ এবং অপাচ্য বর্জ্য পদার্থকে মল আকারে শরীর থেকে নিষ্কাশনের কাজ সম্পন্ন করে।[1]
মানবদেহে পরিপাক নালীর সূচনা ঘটে মুখগহ্বরে এবং এটি পর্যায়ক্রমে গলবিল, অন্ননালী, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্র অতিক্রম করে মলদ্বার বা পায়ুপথে গিয়ে শেষ হয়। একজন জীবিত পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে পেশিটানের কারণে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ মিটার হলেও মৃত্যুর পর পেশি শিথিল হলে এটি প্রায় ৯ মিটার (৩০ ফুট) দীর্ঘ হয়।
শারীরস্থানিক গঠন ও স্তরবিন্যাস
পরিপাক নালীর প্রাচীর মূলত ভেতর থেকে বাইরের দিকে চারটি প্রধান কলাস্থানিক স্তরে গঠিত:
- মিউকোসা (Mucosa): সবচেয়ে ভেতরের শ্লেষ্মাঝিল্লি স্তর, যা এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা গঠিত। এটি পাচক রস ও শ্লেষ্মা (মিউকাস) ক্ষরণ করে এবং পুষ্টি শোষণ করে।
- সাবমিউকোসা (Submucosa): রক্তনালী, লসিকানালী এবং স্নায়ুজালক (Meissner's plexus) সমৃদ্ধ যোজক কলার স্তর, যা মিউকোসাকে পুষ্টি যোগায়।
- মাসকুলারিস এক্সটার্না (Muscularis externa): মসৃণ পেশির স্তর (ভেতরে বৃত্তাকার এবং বাইরে অনুদৈর্ঘ্য পেশি)। এই স্তরের ছন্দোবদ্ধ সংকোচন-প্রসারণ বা পেরিস্টালসিস (Peristalsis) প্রক্রিয়ায় খাদ্য পরিপাক নালীর ভেতর দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হয়।
- সেরোসা বা অ্যাডভেন্টিশিয়া (Serosa / Adventitia): সবচেয়ে বাইরের প্রতিরক্ষামূলক আবরণী স্তর (পেরিটোনিয়ামের ভিসেরাল স্তর)।
প্রধান অংশসমূহ ও কার্যাবলি
১. মুখগহ্বর ও গলবিল (Mouth and Pharynx)
- খাদ্য গ্রহণ এবং দাঁতের সাহায্যে যান্ত্রিক চর্বণ সম্পন্ন হয়।
- লালাগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত লালারসের টায়ালিন উৎসেচক শর্করার পরিপাক শুরু করে এবং খাদ্যকে পিচ্ছিল মণ্ডে (Bolus) পরিণত করে গলধঃকরণে সাহায্য করে।
২. অন্ননালী (Esophagus)
- প্রায় ২৫ সেমি দীর্ঘ পেশিনালী, যা পেরিস্টালসিস তরঙ্গের মাধ্যমে খাদ্যমণ্ডকে গলাধঃকরণের পর পাকস্থলীতে পৌঁছে দেয়।
৩. পাকস্থলী (Stomach)
- 'J' আকৃতির পেশিবহুল থলি, যা হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ($HCl$) এবং পেপসিনোজেন ক্ষরণ করে খাদ্যের অম্লীয় পরিবেশ তৈরি করে ও প্রোটিন পরিপাক করে।
- খাদ্যকে মন্থন প্রক্রিয়ায় আংশিক তরল কাইম বা খাদ্যমণ্ডলে (Chyme) রূপান্তরিত করে।
৪. ক্ষুদ্রান্ত্র (Small Intestine)
- পরিপাক নালীর দীর্ঘতম অংশ (প্রায় ৬ মিটার), যা তিনটি অংশে বিভক্ত—ডুওডেনাম, জেজুনাম ও ইলিয়াম।
- যকৃত থেকে আসা পিত্তরস এবং অগ্ন্যাশয় রসের সাহায্যে স্নেহ, শর্করা ও প্রোটিনের পূর্ণাঙ্গ রাসায়নিক পরিপাক সম্পন্ন হয়।
- প্রাচীরে থাকা কোটি কোটি ক্ষুদ্র প্রবর্ধক বা ভিলাই (Villi)-এর মাধ্যমে পরিপাককৃত সরল পুষ্টি উপাদান রক্ত ও লসিকায় শোষিত হয়।
৫. বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ (Large Intestine and Anus)
- সিকাম (অ্যাপেন্ডিক্স সহ), কোলন (উর্ধ্বগামী, অনুপ্রস্থ, নিম্নগামী ও সিগময়েড), মলাশয় এবং পায়ুছিদ্র নিয়ে গঠিত।
- অপাচ্য খাদ্য অবশিষ্টাংশ থেকে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট পুনরায় শোষণ করে মলকে ঘনীভূত করে।
- অন্ত্রের উপকারী অণুজীব বা মাইক্রোবায়োম ভিটামিন কে ($K$) ও বি-কমপ্লেক্স সংশ্লেষণ করে।
- মলাশয়ে মল সাময়িকভাবে জমা থাকে এবং পায়ুপথের স্ফিংক্টার পেশি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মলত্যাগ সম্পন্ন হয়।[2]
স্নায়বিক ও হরমোনীয় নিয়ন্ত্রণ
পরিপাক নালী স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্র ছাড়াও নিজস্ব একটি অত্যন্ত জটিল স্নায়ুজালক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যাকে 'এন্টেরিক নার্ভাস সিস্টেম' (Enteric Nervous System বা ENS) বলা হয়। অধিক স্নায়ুকোষের উপস্থিতির কারণে এটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রায়ই দেহের "দ্বিতীয় মস্তিষ্ক" বলা হয়। এছাড়া গ্যাস্ট্রিন, সিক্রেটিন ও কোলেসিস্টোকাইনিন (CCK)-এর মতো লোকাল হরমোন পাচক রস নিঃসরণ ও অন্ত্রের চলন নিয়ন্ত্রণ করে।
সাধারণ রোগব্যাধি ও চিকিৎসাগত গুরুত্ব
- গ্যাস্ট্রাইটিস ও পেপটিক আলসার: অতিরিক্ত অ্যাসিড বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে পাকস্থলী ও ডুওডেনামে ক্ষত সৃষ্টি।
- গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD): পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে বুকজ্বালা ও প্রদাহ তৈরি করা।
- ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (IBS) ও ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (IBD): ক্রনিক পেটের ব্যথা, আলসারেটিভ কোলাইটিস ও ক্রোনস ডিজিজ।
- সংক্রমণ ও ডায়রিয়া: খাদ্যদূষণের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের কারণে অন্ত্রের প্রদাহ ও তীব্র পানিশূন্যতা।
- ক্যান্সার: খাদ্যনালী, পাকস্থলী ও কোলোরেক্টাল ক্যান্সার।
