তরুণাস্থি (Cartilage / কোমলাস্থি)
| তরুণাস্থি (Cartilage) | |
|---|---|
পোলারাইজড আলোতে হেমাটোক্সিলিন ও ইওসিন রঞ্জকে রঞ্জিত হায়ালিন তরুণাস্থির আণুবীক্ষণিক দৃশ্য | |
| কলাস্থানিক বিবরণ | |
| ল্যাটিন নাম: | cartilago |
| অংশ: | কঙ্কালতন্ত্র / বিশেষায়িত যোজক কলা |
| ভ্রূণীয় উৎপত্তি: | মেসোডার্ম (মেসেনকাইম কোষীয় স্তর) |
| কোষসমূহ: | কনড্রোব্লাস্ট ও কনড্রোসাইট (ল্যাকুনার অভ্যন্তরে) |
| আবরণী: | পেরিকনড্রিয়াম (Perichondrium) |
| রক্ত সংবহন: | রক্তনালীবিহীন (Avascular); ব্যাপনের মাধ্যমে পুষ্টি সংগৃহীত হয় |
| প্রধান প্রকারভেদ: | হায়ালিন তরুণাস্থি, স্থিতিস্থাপক তরুণাস্থি, শ্বেত-তন্তুময় তরুণাস্থি |
তরুণাস্থি বা কোমলাস্থি (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের ভ্রূণীয় মেসোডার্ম থেকে উদ্ভূত এক প্রকার নমনীয়, অর্ধ-কঠিন, স্থিতিস্থাপক ও বিশেষায়িত কঙ্কাল যোজক কলা।[1] অস্থি অপেক্ষা কম শক্ত হলেও তরুণাস্থি যথেষ্ট চাপ ও ভার বহনে সক্ষম। এটি অস্থিসন্ধিসমূহের সংযোগস্থলে মসৃণ প্রলেপ হিসেবে ঘর্ষণ হ্রাস করে, শরীরের বিভিন্ন নরম অঙ্গের (যেমন: বহিঃকর্ণ, নাক, শ্বাসনালী) অবয়ব রক্ষা করে এবং হাড়ের প্রান্তভাগে কুশন হিসেবে কাজ করে। অধিকাংশ মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভ্রূণাবস্থায় অন্তঃকঙ্কাল মূলত তরুণাস্থি দ্বারা গঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে অস্থিভবন (ossification) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অস্থিতে রূপান্তরিত হয় (তবে হাঙ্গর ও শাপলাপাতা মাছের মতো তরুণাস্থিময় মাছে আজীবন সম্পূর্ণ কঙ্কাল তরুণাস্থিনির্মিত থাকে)।
তরুণাস্থির একটি অন্যতম প্রধান শারীরস্থানিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি রক্তনালীবিহীন (avascular) এবং স্নায়ুবিহীন। ফলে তরুণাস্থির কোষগুলো সরাসরি রক্তপ্রবাহের পরিবর্তে চারপাশের যোজক কলা থেকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় অতি ধীরগতিতে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে। এই কারণে তরুণাস্থি কোনো কারণে আঘাতপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা নিরাময় হতে দীর্ঘ সময় লাগে।
গঠন ও উপাদান
তরুণাস্থি মূলত তিনটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত:
১. তরুণাস্থি কোষসমূহ (Cartilage Cells)
- কনড্রোব্লাস্ট (Chondroblast): অপরিপক্ব ও সক্রিয় কোষ, যা বিভাজিত হয়ে তরুণাস্থির নতুন মাতৃকা ও তন্তু ক্ষরণ করে।
- কনড্রোসাইট (Chondrocyte): পরিণত তরুণাস্থি কোষ। এগুলো মাতৃকার ভেতরে অবস্থিত 'ল্যাকুনা' (Lacuna) নামক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরলপূর্ণ গহ্বরে এককভাবে বা ২ থেকে ৮টি করে গুচ্ছাকারে থাকে।
২. বহিঃকোষীয় মাতৃকা (Extracellular Matrix)
তরুণাস্থির মাতৃকা জেলির মতো স্থিতিস্থাপক এবং মূলত কনড্রিন (Chondrin) নামক বিশেষ প্রোটিন দ্বারা গঠিত। এর রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে রয়েছে কনড্রয়টিন সালফেট (Chondroitin sulfate), কেরাটান সালফেট এবং প্রোটিওগ্লাইকান যৌগ, যা তরুণাস্থিকে উচ্চ চাপ ও সংকোচন সহনশীলতা প্রদান করে।
৩. প্রোটিন তন্তু ও আবরণী
- মাতৃকার মধ্যে টাইপ-২ কোলাজেন তন্তু এবং ইলাস্টিন তন্তু বিভিন্ন ঘনত্বে সজ্জিত থাকে।
- প্রতিটি তরুণাস্থি (আর্টিকুলার তরুণাস্থি ব্যতীত) বাইরে থেকে ঘন যোজক কলার একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর দিয়ে আবৃত থাকে, যাকে পেরিকনড্রিয়াম (Perichondrium) বলা হয়। পেরিকনড্রিয়ামের রক্তনালী থেকেই ব্যাপন প্রক্রিয়ায় তরুণাস্থিতে পুষ্টি উপাদান পরিবাহিত হয়।
প্রধান প্রকারভেদ
মাতৃকার গঠন, তন্তুর প্রকৃতি ও উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তরুণাস্থিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. হায়ালিন বা কাচসদৃশ তরুণাস্থি (Hyaline Cartilage)
- এটি মানবদেহের সবচেয়ে সাধারণ ও বিস্তৃত তরুণাস্থি। এর মাতৃকা সমসত্ত্ব, স্বচ্ছ এবং নীলাভ-সাদা কাচের মতো দেখায়। এতে সূক্ষ্ম কোলাজেন তন্তু বিদ্যমান থাকে।
- অবস্থান: দীর্ঘ অস্থির সন্ধিমুখ (Articular cartilage), নাসিকা ব্যবধায়ক (Nasal septum), ল্যারিংসের থাইরয়েড ও ক্রিকয়েড তরুণাস্থি, ট্রাকিয়া ও ব্রঙ্কাইয়ের রিং এবং পর্শুকা বা পাঁজরের কোস্টাল তরুণাস্থি।
২. স্থিতিস্থাপক বা ইলাস্টিক তরুণাস্থি (Elastic Cartilage)
- এই তরুণাস্থির মাতৃকায় প্রচুর পরিমাণে হলুদ বর্ণের স্থিতিস্থাপক (ইলাস্টিন) তন্তু ঘন জালকের মতো বিস্তৃত থাকে। ফলে এটি অত্যন্ত নমনীয় এবং ভাঁজ করার পর পুনরায় পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে।
- অবস্থান: বহিঃকর্ণ বা পিনা (Pinna), কর্ণকুহর (Eustachian tube) এবং এপিগ্লটিস বা উপজিহ্বা।
৩. শ্বেত-তন্তুময় তরুণাস্থি (Fibrocartilage)
- এটি সবচেয়ে শক্ত ও মজবুত তরুণাস্থি। এর মাতৃকায় ঘন ও সমান্তরালভাবে সজ্জিত সাদা টাইপ-১ কোলাজেন তন্তুর বান্ডিল থাকে। এতে পেরিকনড্রিয়াম আবরণী থাকে না।
- অবস্থান: মেরুদণ্ডের কশেরুকার মধ্যবর্তী ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক (Intervertebral disc), পিউবিক সিমফাইসিস (Pubic symphysis) এবং হাঁটুর অর্ধচন্দ্রাকার মেনিসকাস (Meniscus)।
প্রধান শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি
- ঘর্ষণ হ্রাস ও শক শোষণ: অস্থিসন্ধির চলন মসৃণ রাখা এবং দৌড়ানো বা লাফালাফির সময় অস্থিতে আসা যান্ত্রিক শক শোষণ করা।
- শারীরিক কাঠামো প্রদান: কান, নাক, শ্বাসনালী ও স্বরযন্ত্রের উন্মুক্ত নালীর আকৃতি ও নমনীয়তা বজায় রাখা।
- অস্থি গঠনে মডেল হিসেবে কাজ: ভ্রূণাবস্থায় এবং শৈশবে দীর্ঘ অস্থির এপিফাইসিয়াল প্লেটে তরুণাস্থি বিভাজনের মাধ্যমে হাড়ের অনুদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
চিকিৎসাগত গুরুত্ব ও রোগব্যাধি
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis): বার্ধক্য বা অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অস্থিসন্ধির আর্টিকুলার তরুণাস্থি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণ ও তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়।
- হার্নিয়েটেড ডিস্ক (Slipped Disc): মেরুদণ্ডের ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্কের ফাইব্রোকার্টিলেজ ফেটে গিয়ে ভেতরের জেলিসদৃশ অংশ স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলে তীব্র সায়াটিকা ব্যথার উদ্রেক করে।
- মেনিসকাস ইনজুরি (Meniscus Tear): খেলাধুলার সময় হাঁটুতে অতিরিক্ত চাপ বা মোচড় লাগলে হাঁটুর ফাইব্রোকার্টিলেজ ছিঁড়ে যেতে পারে।
- রক্তনালীর অনুপস্থিতির কারণে তরুণাস্থির ক্ষয়ক্ষতি প্রাকৃতিক উপায়ে পুনরুজ্জীবিত হওয়া অত্যন্ত কঠিন, যার কারণে আধুনিক অর্থোপেডিক্সে কনড্রোসাইট প্রতিস্থাপন বা স্টেম সেল থেরাপির মতো উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ করা হচ্ছে।
