আবরণী কলা / এপিথেলিয়াম (Epithelium / Epithelial Tissue)
আবরণী কলা বা এপিথেলিয়াম (Template:Lang-en, বহুবচনে Template:Lang-en) হলো প্রাণীদেহের প্রধান চার প্রকার মৌলিক কলার (যোজক কলা, পেশিকলা ও স্নায়ুকলাসহ) অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কলা। এই কলা প্রাণীদেহের বহিঃত্বক গঠন করে এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, দেহগহ্বর, রক্তনালী, শ্বাসনালী ও পরিপাকনালীর ভেতরের প্রাচীরে একটি অবিচ্ছিন্ন প্রতিরক্ষামূলক আস্তরণ তৈরি করে।[1] এছাড়া মানবদেহের সমস্ত বহিঃক্ষরা ও অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি মূলত বিশেষায়িত আবরণী কোষ দ্বারা গঠিত হয়।
আবরণী কলার কোষগুলো একটি অ-কোষীয় প্রোটিনসমৃদ্ধ পাতলা ভিত্তিপর্দা বা 'বেসমেন্ট মেমব্রেন' (Basement membrane)-এর ওপর ঘনিষ্ঠভাবে সজ্জিত থাকে। এই কলায় সরাসরি কোনো রক্তনালী থাকে না (avascular); তাই কোষগুলো তার নিচের যোজক কলা থেকে ব্যাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে।
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- কোষের ঘনত্ব: কোষগুলোর মধ্যে আন্তঃকোষীয় স্থান এবং আন্তঃকোষীয় মাতৃকা (extracellular matrix) অত্যন্ত কম থাকে।
- কোষীয় সংযোগ (Cell Junctions): কোষগুলো টাইট জাংশন, ডেসমোজোম এবং গ্যাপ জাংশনের মতো বিশেষ সংযোগ দ্বারা পরস্পরের সাথে শক্তভাবে আবদ্ধ থাকে।
- পোলারিটি (Polarity): প্রতিটি আবরণী কোষের একটি মুক্ত উপরিভাগ (Apical surface) এবং ভিত্তিপর্দার সাথে যুক্ত একটি নিম্নভাগ (Basal surface) থাকে।
- পুনরুৎপাদন ক্ষমতা: ঘর্ষণ বা ক্ষয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই কলার কোষগুলো দ্রুত মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে ক্ষতি পূরণ করতে পারে।
শ্রেণিবিভাগ
কোষের স্তরের সংখ্যা এবং কোষের আকারের ওপর ভিত্তি করে আবরণী কলাকে প্রধানত দুটি বৃহৎ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
১. সরল আবরণী কলা (Simple Epithelium)
এই কলায় ভিত্তিপর্দার ওপর কোষের একটিমাত্র স্তর সাজানো থাকে। এটি মূলত শোষণ, ক্ষরণ ও পরিস্রাবণের কাজে অংশ নেয়:
- সরল আঁইশাকার বা স্কোয়ামাস (Simple Squamous): পাতলা, চ্যাপ্টা ও বহুভুজাকার কোষ। ফুসফুসের অ্যালভিওলাই, রক্তনালীর প্রাচীর (এন্ডোথেলিয়াম) এবং বোম্যান্স ক্যাপসুলে পাওয়া যায়।
- সরল ঘনকাকার বা কিউবয়েডাল (Simple Cuboidal): ঘনক বা কিউব-আকৃতির কোষ। বৃক্কীয় নালিকা (Kidney tubules) ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র গ্রন্থিনালীতে উপস্থিত থাকে।
- সরল স্তম্ভাকার বা কলামনার (Simple Columnar): লম্বা স্তম্ভের মতো কোষ। পাকস্থলী ও অন্ত্রের ভেতরের প্রাচীরে থাকে এবং পাচক রস ক্ষরণ ও খাদ্য শোষণে কাজ করে।
- সিলিয়াযুক্ত স্তম্ভাকার (Ciliated Columnar): কোষের শীর্ষে সূক্ষ্ম চুলের মতো সিলিয়া থাকে (যেমন: শ্বাসনালী ও ডিম্বনালী বা ফ্যালোপিয়ান টিউব), যা শ্লেষ্মা বা ডিম্বাণু সঞ্চালনে সাহায্য করে।
- ছদ্ম-স্তরীভূত আবরণী কলা (Pseudostratified Columnar): কোষগুলো একটি স্তরেই থাকে কিন্তু নিউক্লিয়াস বিভিন্ন উচ্চতায় অবস্থান করায় একাধিক স্তর বলে মনে হয় (যেমন: শ্বাসনালীর ট্রাকিয়া ও ব্রঙ্কাই)।
২. স্তরীভূত বা যৌগিক আবরণী কলা (Stratified Epithelium)
ভিত্তিপর্দার ওপর কোষগুলো একাধিক স্তরে সজ্জিত থাকে। এটি প্রধানত যান্ত্রিক ঘর্ষণ ও রাসায়নিক আঘাত থেকে অঙ্গকে সুরক্ষা দেয়:
- স্তরীভূত কেরাটিনযুক্ত স্কোয়ামাস (Stratified Keratinized Squamous): ওপরের স্তরের কোষগুলো মৃত ও শক্ত কেরাটিন প্রোটিনযুক্ত (যেমন: মানবদেহের শুষ্ক ত্বক)।
- স্তরীভূত কেরাটিনবিহীন স্কোয়ামাস (Stratified Non-keratinized Squamous): আর্দ্র উপরিভাগে অবস্থান করে (যেমন: মুখগহ্বর, খাদ্যনালী, জিহ্বা ও যোনিপথের আস্তরণ)।
- স্তরীভূত কিউবয়েডাল ও কলামনার: ঘর্মগ্রন্থির নালী ও লালাগ্রন্থির বৃহত্তর নালীতে বিরলভাবে উপস্থিত থাকে।
- রূপান্তরশীল বা ট্রানজিশনাল আবরণী কলা (Transitional Epithelium / Urothelium): প্রসারণের সাথে সাথে এই কলার কোষের আকার পরিবর্তিত হতে পারে (যেমন: মূত্রাশয়, মূত্রনালী ও রেনাল পেলভিস)।
প্রধান শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি
- সুরক্ষা (Protection): ত্বক ও শ্লেষ্মাঝিল্লির মাধ্যমে জীবাণুর সংক্রমণ, রাসায়নিক ক্ষয় এবং পানিশূন্যতা থেকে অভ্যন্তরীণ টিস্যুকে রক্ষা করা।
- ক্ষরণ (Secretion): ঘাম, লালা, শ্লেষ্মা (Mucus), পাচক উৎসেচক এবং হরমোন নিঃসরণ করা।
- শোষণ (Absorption): অন্ত্রের মাইক্রোভিলিযুক্ত আবরণী কোষ দ্বারা পরিপাককৃত পুষ্টি উপাদান রক্তে শোষণ করা।
- পরিস্রাবণ ও ব্যাপন (Filtration & Diffusion): বৃক্কে মূত্র উৎপাদন এবং ফুসফুসের অ্যালভিওলাইয়ে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের গ্যাসীয় বিনিময় ঘটানো।
- সংবেদনশীলতা (Sensory Reception): ত্বক, জিহ্বার স্বাদমুকুল, নাসিকা গহ্বরের ঘ্রাণজ কোষ এবং চোখের রেটিনার মাধ্যমে বাহ্যিক সংবেদন গ্রহণ।
চিকিৎসাগত গুরুত্ব (Clinical Significance)
- কার্সিনোমা (Carcinoma): আবরণী কোষ থেকে উদ্ভূত ক্যান্সারকে কার্সিনোমা বলা হয় (যেমন: স্তন ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, ত্বকের মেলানোমা বা স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা)। মানবদেহের প্রায় ৮৫% ক্যান্সার আবরণী কলাতেই ঘটে।
- মেটাপ্লাসিয়া (Metaplasia): দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি বা ক্ষতিকর উদ্দীপনার ফলে এক প্রকার আবরণী কলা অন্য প্রকারে রূপান্তরিত হওয়া (যেমন: ধূমপায়ীদের শ্বাসনালীর সিলিয়াযুক্ত স্তম্ভাকার কলা স্তরীভূত স্কোয়ামাস কলায় রূপান্তরিত হওয়া)।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ Ross, M. H., & Pawlina, W. (2015). Histology: A Text and Atlas: With Correlated Cell and Molecular Biology (7th ed.). Lippincott Williams & Wilkins, পৃ. ৫২৮, ৬০৪। ISBN 978-1451187427.
