ক্লোনিং
ক্লোনিং (Cloning) হলো জীববিজ্ঞানে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জিনগতভাবে সম্পূর্ণ অভিন্ন জীব বা কোষ তৈরি করা হয়। প্রকৃতিতে কিছু ব্যাকটেরিয়া, পোকামাকড় এবং উদ্ভিদ অযৌন প্রজননের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিরূপ তৈরি করে। "ক্লোন" শব্দের অর্থ হলো অবিকল প্রতিরূপ, আর এই প্রতিরূপ তৈরির বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকেই ক্লোনিং বলা হয়।
বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া
প্রতিটি জীব অসংখ্য কোষ (Cell) দ্বারা গঠিত। জীবের কোষে প্রধানত দুই ধরনের কোষ থাকে: একটি হলো সোমাটিক বা দেহকোষ (Somatic cell) এবং অন্যটি হলো জনন কোষ বা জার্ম সেল (Germ cell)। জনন কোষগুলো প্রজননে অংশ নেয়। স্ত্রী প্রাণীর জনন কোষকে ডিম্বাণু এবং পুরুষ প্রাণীর জনন কোষকে শুক্রাণু বলা হয়। জনন কোষ বাদে শরীরের অন্যান্য সমস্ত কোষকে সোমাটিক কোষ বা দেহকোষ বলা হয়।
প্রতিটি কোষের কেন্দ্রে একটি নিউক্লিয়াস থাকে, যেখানে ক্রোমোজোম অবস্থান করে। সোমাটিক কোষের নিউক্লিয়াসে ক্রোমোজোমগুলো জোড়ায় জোড়ায় থাকে, কিন্তু জনন কোষে ক্রোমোজোম থাকে এককভাবে। সাধারণ প্রজননের সময় পুরুষ ও স্ত্রী জনন কোষের মিলনে ক্রোমোজোমের জোড়া তৈরি হয় এবং ভ্রূণ গঠিত হয়, যা বিভাজিত হয়ে শিশু হিসেবে জন্ম নেয়।
ক্লোনিং পদ্ধতিতে নতুন জীব সৃষ্টির ধাপ:
- প্রথমে একটি স্ত্রী প্রাণীর ডিম্বাণু থেকে একক ক্রোমোজোমযুক্ত নিউক্লিয়াসটি অপসারণ করে কেবল ডিম্বাণুর ফাঁকা আবরণটি রাখা হয়।
- এরপর অপর একটি পুরুষ বা স্ত্রী প্রাণীর সোমাটিক কোষ (দেহকোষ) থেকে জোড়া ক্রোমোজোমযুক্ত নিউক্লিয়াসটি সংগ্রহ করে সেই নিউক্লিয়াসবিহীন ডিম্বাণুতে প্রবেশ করানো হয়।
- ফলে ডিম্বাণুটি পূর্ণাঙ্গ বা জোড়া ক্রোমোজোমযুক্ত নিউক্লিয়াস লাভ করে।
- এরপর কিছু রাসায়নিক বা বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা প্রয়োগ করে এই কোষটিকে একটি ভ্রূণে পরিণত করা হয়।
- তৈরি হওয়া ভ্রূণটিকে একটি স্ত্রী প্রাণীর জরায়ুতে (Uterus) স্থাপন করা হয়।
- সাধারণ গর্ভধারণের নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর একটি ক্লোন শিশুর জন্ম হয়।
এই প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া শিশুটি পুরোপুরি সেই প্রাণীটির অবিকল প্রতিরূপ (clone) হয়, যার শরীর থেকে সোমাটিক কোষটি (দেহকোষ) সংগ্রহ করা হয়েছিল।
ক্লোনিং-এর অন্যান্য ব্যবহার
ক্লোনিং বলতে যেহেতু অবিকল প্রতিরূপ বা কপি তৈরি করা বোঝায়, তাই তথ্যপ্রযুক্তি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে হুবহু একই রকম সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার বা ডেটার অনুলিপি তৈরি করাকেও অনেক সময় ক্লোনিং বলা হয় (যেমন: হার্ড ড্রাইভ ক্লোনিং)।
ক্লোনিং প্রক্রিয়ার ত্রুটি ও সমালোচনা
ক্লোনিং প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক বিতর্ক রয়েছে:
- জিনগত ত্রুটি ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি: ক্লোন করা প্রাণীদের মধ্যে অনেক সময় জন্মগত জিনগত ত্রুটি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব এবং অকাল বার্ধক্য দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্লোন করা প্রথম ভেড়া 'ডলি' খুব অল্প বয়সেই ফুসফুসের রোগে মারা গিয়েছিল।
- নৈতিক বিতর্ক: মানব ক্লোনিং বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশেই আইনত নিষিদ্ধ। এটি মানবতা, মানুষের আত্মপরিচয় এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী বলে মনে করা হয়।
- সাফল্যের নিম্ন হার: ক্লোনিং প্রক্রিয়ার সাফল্যের হার অত্যন্ত কম। একটি সফল ক্লোন প্রাণী তৈরি করতে শত শত ভ্রূণ নষ্ট করতে হয়, যা প্রাণী অধিকার কর্মীদের সমালোচনার প্রধান কারণ।
