ভিটামিন
ভিটামিন (Template:Lang-en), যা বাংলায় খাদ্যপ্রাণ নামে পরিচিত, হলো অতি সামান্য পরিমাণে প্রয়োজনীয় এমন কিছু জৈব যৌগ যা জীবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় বিপাকীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য অপরিহার্য। ১৯১২ সালে পোলিশ জৈবরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক লক্ষ্য করেন যে এই যৌগগুলো জীবনের জন্য অপরিহার্য এবং প্রাথমিকভাবে এদের অ্যামিনো যৌগ বিবেচনা করে নাম দেন 'Vital amine' বা Vitamine। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় যে সব ভিটামিন অ্যামিনো যৌগ নয়; ফলে নামের শেষের 'e' বাদ দিয়ে আধুনিক পরিভাষা Vitamin স্থির করা হয়।
ভিটামিন নিজে সরাসরি কোনো শক্তি উৎপাদন বা দেহের গাঠনিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। তবে এটি শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া, এনজাইমের কার্যকারিতা (কো-এনজাইম হিসেবে) এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সচল রাখতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
ভিটামিনের শ্রেণিবিন্যাস
মানবদেহে ১৩টি স্বীকৃত অপরিহার্য ভিটামিন রয়েছে। দ্রবণীয়তার ওপর ভিত্তি করে এদের দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
- স্নেহ-দ্রবণীয় ভিটামিন (Fat-soluble vitamins): ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই এবং ভিটামিন কে চর্বি ও ফ্যাটি মাধ্যমে দ্রবীভূত হয়। এগুলো খাদ্যনালিতে শোষিত হতে পিত্তরসের (bile) সহায়তা প্রয়োজন এবং দেহের যকৃৎ ও মেদকলায় সঞ্চিত থাকে।
- জল-দ্রবণীয় ভিটামিন (Water-soluble vitamins): ভিটামিন সি এবং বি-কমপ্লেক্স গ্রুপের ৮টি ভিটামিন ($B_1, B_2, B_3, B_5, B_6, B_7, B_9, B_{12}$) পানিতে সহজে দ্রবীভূত হয়। এগুলো সরাসরি রক্তে শোষিত হয় এবং উদ্বৃত্ত অংশ শরীর থেকে মূত্রের মাধ্যমে নির্গত হয় (ভিটামিন $B_{12}$ ব্যতীত, যা যকৃতে কিছুটা জমা থাকে)।
প্রধান ভিটামিনসমূহের তালিকা ও কার্যকারিতা
| ভিটামিন | রাসায়নিক নাম | দ্রবণীয়তা | প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক চাহিদা (RDA) | প্রধান অভাবজনিত রোগ |
|---|---|---|---|---|
| ভিটামিন এ | রেটিনল ও ক্যারোটিনয়েড | চর্বি | ৯০০ µg | রাতকানা (Night blindness), জেরোপথ্যালমিয়া, কেরাটোম্যালাসিয়া |
| ভিটামিন বি১ | থায়ামিন (Thiamine) | পানি | ১.২ mg | বেরিবেরি (Beriberi), ওয়ার্নিক-করসাকফ সিন্ড্রোম |
| ভিটামিন বি২ | রিবোফ্লাভিন (Riboflavin) | পানি | ১.৩ mg | অ্যারিবোফ্লাভিনোসিস, মুখে ও ঠোঁটে ঘা (Cheilosis), গ্লসাইটিস |
| ভিটামিন বি৩ | নায়াসিন বা নিকোটিনিক অ্যাসিড | পানি | ১৬ mg | পেলেগ্রা (Pellagra - ডায়রিয়া, ডার্মাটাইটিস, ডিমেনশিয়া) |
| ভিটামিন বি৫ | প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড | পানি | ৫ mg | প্যারেস্থেসিয়া (হাত-পায়ে জ্বালাপোড়া অনুভূতি) |
| ভিটামিন বি৬ | পাইরিডক্সিন (Pyridoxine) | পানি | ১.৩–১.৭ mg | রক্তস্বল্পতা (Microcytic anemia), স্নায়বিক সমস্যা |
| ভিটামিন বি৭ | বায়োটিন (Biotin) | পানি | ৩০ µg | ত্বক ও চুলের সমস্যা, স্নায়বিক দুর্বলতা |
| ভিটামিন বি৯ | ফলিক অ্যাসিড (Folate) | পানি | ৪০০ µg | মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, গর্ভাবস্থায় নিউরাল টিউব ত্রুটি |
| ভিটামিন বি১২ | সায়ানোকোবালামিন | পানি | ২.৪ µg | পারনিশিয়াস অ্যানিমিয়া (Pernicious anemia), স্নায়ুর ক্ষতি |
| ভিটামিন সি | অ্যাসকরবিক অ্যাসিড | পানি | ৯০ mg | স্কার্ভি (Scurvy), মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, ক্ষত নিরাময়ে বিলম্ব |
| ভিটামিন ডি | কোলেস্টেরল ও ক্যালসিফেরল | চর্বি | ১৫–২০ µg (৬০০–৮০০ IU) | শিশুদের রিকেটস (Rickets), বয়স্কদের অস্টিওম্যালাসিয়া |
| ভিটামিন ই | টোকোফেরল ও টোকোট্রাইনল | চর্বি | ১৫ mg | হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, প্রজনন সমস্যা, পেশি দুর্বলতা |
| ভিটামিন কে | ফাইলোকুইনোন ও মেনাকুইনোন | চর্বি | ১২০ µg | রক্ত জমাট না বাঁধা ও অত্যধিক রক্তক্ষরণ |
প্রাকৃতিক খাদ্যের বর্ণভিত্তিক পুষ্টিগুণ
ফলমূল ও শাকসবজির প্রাকৃতিক রঙে বিশেষ পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিদ্যমান থাকে:
- সাদা: রসুন, পেঁয়াজ ও মাশরুমে অ্যালিসিন ও ফ্ল্যাভোনয়েড থাকে, যা কোষ সুরক্ষা ও টিউমার প্রতিরোধে সাহায্য করে।
- লাল ও বেগুনি: টমেটো ও বেগুনি আঙুরে অ্যান্থোসায়ানিন ও লাইকোপিন থাকে, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হৃদযন্ত্র সুরক্ষাকারী।
- হলুদ ও কমলা: গাজর ও পাকা পেঁপেতে বিটা-ক্যারোটিন এবং ভিটামিন সি প্রচুর থাকে, যা চোখের জ্যোতি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
- সবুজ: শাকসবজিতে প্রচুর আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন কে থাকে, যা রক্ত তৈরিতে ও দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে অপরিহার্য।
ভিটামিনের অতিরিক্ত গ্রহণজনিত জটিলতা (হাইপারভিটামিনোসিস)
যদিও পরিমিত ভিটামিন শরীরের জন্য অপরিহার্য, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে কৃত্রিম ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট দীর্ঘকাল মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ করা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে:
- স্নেহ-দ্রবণীয় ভিটামিন (যেমন: ভিটামিন এ এবং ডি) সহজে দেহ থেকে নির্গত হতে পারে না এবং যকৃতে জমা হয়ে বিষাক্ততা (Hypervitaminosis A & D) সৃষ্টি করে, যা যকৃৎ ও কিডনির ক্ষতি করে।
- গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক উৎস (যেমন: শাকসবজি ও ফলমূল) থেকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
শ্রেণী:পুষ্টি উপাদান
শ্রেণী:ভিটামিন
শ্রেণী:শারীরবৃত্তীয় উপাদান
শ্রেণী:জৈব রসায়ন
