হৃৎপিণ্ড / হূৎপিণ্ড (Heart / মানব হৃৎযন্ত্র)

From LTRC
হৃৎপিণ্ড (Heart)
মানব হৃৎপিণ্ড
মানবদেহের হৃৎপিণ্ডের বহিঃদৃশ্য
শারীরস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় বিবরণ
ল্যাটিন নাম: cor (গ্রিক: kardia)
তন্ত্র: সংবহনতন্ত্র (Circulatory system)
অবস্থান: বক্ষগহ্বর (মিডিয়াস্টিনাম), দুই ফুসফুসের মাঝে সামান্য বামে
আকার ও ওজন: প্রায় একজনের হাতের এক মুষ্টির সমান; পুরুষে প্রায় ২৮০–৩৪০ গ্রাম, নারীতে প্রায় ২৩০–২৮০ গ্রাম
প্রকোষ্ঠ: ৪টি (দুটি অলিন্দ বা Atria এবং দুটি নিলয় বা Ventricles)
আবরণী: পেরিকার্ডিয়াম (Pericardium)
প্রধান কাজ: অবিরাম ছন্দোবদ্ধ সংকোচনের মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত পাম্প ও সংবহন করা

হৃৎপিণ্ড বা হৃদযন্ত্র (Template:Lang-la, Template:Lang-el, Template:Lang-en) হলো মানবদেহ ও মেরুদণ্ডী প্রাণীদের সংবহনতন্ত্রের প্রধান কেন্দ্র এবং একটি স্বয়ংক্রিয়, বিশেষায়িত ও পেশিবহুল ফাঁপা পাম্পিং অঙ্গ।[1] এটি বক্ষগহ্বরের (Thoracic cavity) মিডিয়াস্টিনাম অঞ্চলে, দুই ফুসফুসের মধ্যবর্তী স্থানে বক্ষাস্থি বা স্টার্নামের পেছনে এবং কিছুটা বাম পাশে অবস্থান করে। মানবদেহের অনৈচ্ছিক কার্ডিয়াক পেশি দ্বারা গঠিত এই অঙ্গটি আজীবন অবিরাম ছন্দোবদ্ধ সংকোচন (Systole) ও প্রসারণের (Diastole) মাধ্যমে দেহের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত রক্ত ফুসফুসে পরিশোধনের জন্য পাঠায়।

হৃদরোগ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে বিশ্ব হার্ট দিবস (World Heart Day) পালিত হয়।[2]

শারীরস্থানিক গঠন ও প্রকোষ্ঠসমূহ

১. আবরণী ও প্রাচীর স্তর

  • পেরিকার্ডিয়াম (Pericardium): হৃৎপিণ্ড দ্বিস্তরীয় প্রতিরক্ষামূলক পেরিকার্ডিয়াল ঝিল্লি দ্বারা বেষ্টিত থাকে। এই দুই স্তরের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে 'পেরিকার্ডিয়াল ফ্লুইড' থাকে, যা বাহ্যিক আঘাত থেকে হৃৎপিণ্ডকে রক্ষা করে এবং সংকোচনের সময় ঘর্ষণজনিত বাধা রোধ করে।
  • হৃদপ্রাচীর (Heart Wall): হৃৎপিণ্ডের প্রাচীর প্রধানত তিনটি স্তরে গঠিত:
    • এপিকার্ডিয়াম (Epicardium): সবচেয়ে বাইরের পাতলা প্রতিরক্ষামূলক মেসোথেলিয়াল স্তর।
    • মায়োকার্ডিয়াম (Myocardium): মধ্যবর্তী পুরু ও শক্তিশালী স্তর, যা কার্ডিয়াক পেশিকলা দ্বারা গঠিত এবং রক্ত পাম্পের প্রধান শক্তি যোগায়।
    • এন্ডোকার্ডিয়াম (Endocardium): সবচেয়ে ভেতরের মসৃণ এপিথেলিয়াল স্তর, যা প্রকোষ্ঠ ও কপাটিকাগুলোকে ঢেকে রাখে।

২. অভ্যন্তরীণ প্রকোষ্ঠসমূহ (Chambers)

মানব হৃৎপিণ্ড সম্পূর্ণ চারটি স্বতন্ত্র প্রকোষ্ঠে বিভক্ত:

  • ডান অলিন্দ (Right Atrium): অপেক্ষাকৃত পাতলা প্রাচীরবিশিষ্ট ওপরের ডান প্রকোষ্ঠ। এটি ঊর্ধ্ব মহাশিরা (SVC), নিম্ন মহাশিরা (IVC) এবং করোনারি সাইনাসের মাধ্যমে সমগ্র দেহ থেকে অক্সিজেনবিহীন দূষিত রক্ত গ্রহণ করে।
  • বাম অলিন্দ (Left Atrium): চারটি পালমোনারি শিরার মাধ্যমে ফুসফুস থেকে পরিশোধিত অক্সিজেনসমৃদ্ধ বিশুদ্ধ রক্ত গ্রহণ করে।
  • ডান নিলয় (Right Ventricle): ডান অলিন্দ থেকে রক্ত গ্রহণ করে ট্রাইকাসপিড কপাটিকার মাধ্যমে এবং তা পালমোনারি ধমনির সাহায্যে ফুসফুসে পাঠায়।
  • বাম নিলয় (Left Ventricle): হৃৎপিণ্ডের সবচেয়ে পুরু ও শক্তিশালী পেশিবহুল প্রকোষ্ঠ। এটি বাইকাসপিড (মাইট্রাল) কপাটিকার মাধ্যমে বাম অলিন্দ থেকে রক্ত গ্রহণ করে মহাধমনি (Aorta)-র সাহায্যে সারা শরীরে রক্ত পাম্প করে ছড়িয়ে দেয়।

৩. কপাটিকাসমূহ (Heart Valves)

রক্তের একমুখী প্রবাহ বজায় রাখতে হৃৎপিণ্ডে চারটি প্রধান কপাটিকা থাকে:

  1. ট্রাইকাসপিড কপাটিকা (Tricuspid Valve): ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের মাঝে অবস্থিত (তিন পাল্লা বিশিষ্ট)।
  2. বাইকাসপিড বা মাইট্রাল কপাটিকা (Bicuspid / Mitral Valve): বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের মাঝে অবস্থিত (দুই পাল্লা বিশিষ্ট)।
  3. পালমোনারি কপাটিকা (Pulmonary Valve): ডান নিলয় ও পালমোনারি ধমনির সংযোগস্থলে অবস্থিত অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা।
  4. অ্যাওর্টিক কপাটিকা (Aortic Valve): বাম নিলয় ও মহাধমনির সংযোগস্থলে অবস্থিত অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা।

হৃদযন্ত্রের সংবহন প্রক্রিয়া (Cardiac Circulation)

মানবদেহে দ্বি-সংবহন (Double circulation) তন্ত্র বিদ্যমান:

  1. সিস্টেমিক সংবহন: বাম নিলয় $\rightarrow$ মহাধমনি $\rightarrow$ দেহকোষ ও কলা $\rightarrow$ মহাশিরা $\rightarrow$ ডান অলিন্দ।
  2. পালমোনারি সংবহন: ডান নিলয় $\rightarrow$ পালমোনারি ধমনি $\rightarrow$ ফুসফুস (গ্যাসীয় বিনিময়) $\rightarrow$ পালমোনারি শিরা $\rightarrow$ বাম অলিন্দ।

হৃৎপিণ্ডের নিজস্ব পেশিতে রক্ত সরবরাহের জন্য ডান ও বাম করোনারি ধমনি (Coronary arteries) নিয়োজিত থাকে।

চিকিৎসাগত প্রযুক্তি ও ইন্টারভেনশন

করোনারি স্টেন্ট ও এনজিওপ্লাস্টি (Coronary Stent)

করোনারি ধমনিতে চর্বির প্লাক জমে রক্তনালী বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে গেলে ক্যাথিটারের সাহায্যে বেলুন ফুলিয়ে রক্তনালী প্রসারিত করা হয় এবং সেখানে একটি ক্ষুদ্র ধাতব স্প্রিংসদৃশ জালিকা বা স্টেন্ট (Stent) বসানো হয়। বর্তমানে প্রধানত দুই ধরণের স্টেন্ট ব্যবহৃত হয়:

  • ড্রাগ-ইলিউটিং স্টেন্ট (DES): বিশেষ ওষুধযুক্ত প্রলেপ দেওয়া থাকে, যা রক্তনালী পুনরায় বন্ধ হওয়া রোধ করে।
  • বেয়ার-মেটাল স্টেন্ট (BMS): খাঁটি স্টেইনলেস স্টিল বা কোবাল্ট-ক্রোমিয়াম ধাতুর তৈরি সাধারণ স্টেন্ট।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্টেম সেল গবেষণা

গবেষণাগারে ভ্রূণীয় স্টেম সেল (Stem cells) ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে কার্যকরী কার্ডিয়াক পেশিকলা তৈরি করার ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন, যা ভবিষ্যতে মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনে ক্ষতিগ্রস্ত হৃদপেশির পুনর্জন্মে বৈপ্লবিক সমাধান দিতে পারে।

সাধারণ হৃদরোগসমূহ

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র