স্নায়ুতন্ত্র (Nervous System / স্নায়বিক তন্ত্র)
| স্নায়ুতন্ত্র (Nervous system) | |
|---|---|
মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র: কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (লাল) এবং প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (নীল) | |
মায়েলিনযুক্ত মোটর নিউরনের বিভিন্ন গাঠনিক অংশ | |
| শারীরস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় বিবরণ | |
| ল্যাটিন নাম: | systema nervosum |
| ভ্রূণীয় উৎপত্তি: | একটোডার্ম (Ectoderm / নিউরাল টিউব ও নিউরাল ক্রেস্ট) |
| প্রধান বিভাগসমূহ: | কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (CNS) ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (PNS) |
| কোষীয় উপাদান: | নিউরন বা স্নায়ুকোষ (প্রায় ১০০ বিলিয়ন) এবং নিউরোগ্লিয়াল কোষ |
| প্রধান অঙ্গসমূহ: | মস্তিষ্ক, সুষুম্নাকাণ্ড, করোটিক স্নায়ু, সুষুম্না স্নায়ু ও গ্যাংগলিয়া |
| প্রধান কাজ: | উদ্দীপনা গ্রহণ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি, অঙ্গসমূহের কাজের সমন্বয়সাধন, স্মৃতি, শিখন ও উচ্চতর জ্ঞানীয় নিয়ন্ত্রণ |
স্নায়ুতন্ত্র (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো বহুকোষী প্রাণিদেহের একটি অত্যন্ত জটিল ও বিশেষায়িত সংবেদী অঙ্গসংস্থানিক নেটওয়ার্ক, যা পরিবেশের বিভিন্ন উদ্দীপনা গ্রহণ করে, তা দ্রুত বৈদ্যুতিক-রাসায়নিক সংকেতে রূপান্তর করে প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণ করে এবং দেহের বিভিন্ন পেশি ও গ্রন্থিতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ প্রেরণের মাধ্যমে সামগ্রিক শারীরিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় সাধন করে।[1] এটি প্রাণীদেহের দ্রুততম সংকেত সঞ্চালন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে এবং মেরুদণ্ডী প্রাণীদের স্মৃতিশক্তি, শিখন, চিন্তা, চেতনা ও আবেগীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
প্রাপ্তবয়স্ক মানবদেহে আনুমানিক ৮৬ থেকে ১০০ বিলিয়ন নিউরন বা স্নায়ুকোষ থাকে, যা বিভাজনে অক্ষম এবং একে অপরের সাথে ট্রিলিয়ন সিন্যাপ্টিক সংযোগের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে।
স্নায়ুতন্ত্রের শারীরস্থানিক ও কার্যগত শ্রেণিবিভাগ
কাঠামো ও শারীরবৃত্তীয় কাজের ভিত্তিতে স্নায়ুতন্ত্রকে প্রধানত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
১. কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central Nervous System - CNS)
এটি দেহের সামগ্রিক তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও আদেশ জারির প্রধান প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র:
- মস্তিষ্ক (Brain): করোটির মধ্যে সুরক্ষিত অংশ, যা গুরুমস্তিষ্ক (Cerebrum), ডায়েনসেফালন (Thalamus ও Hypothalamus), লঘুমস্তিষ্ক (Cerebellum) এবং ব্রেনস্টেম (Midbrain, Pons, Medulla oblongata) নিয়ে গঠিত।
- সুষুম্নাকাণ্ড (Spinal Cord): মেরুদণ্ডের নালীতে অবস্থিত স্নায়ুরজ্জু, যা মস্তিষ্ক ও প্রান্তীয় স্নায়ুর মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানের প্রধান পথ এবং স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া (Reflex actions) পরিচালনা করে।
২. প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (Peripheral Nervous System - PNS)
কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের বাইরে অবস্থিত সমস্ত স্নায়ু ও গ্যাংগলিয়ার সমন্বয়ে এটি গঠিত। এতে ১২ জোড়া করোটিক স্নায়ু এবং ৩১ জোড়া সুষুম্না স্নায়ু (Spinal nerves) অন্তর্ভুক্ত। প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রকে কার্যগতভাবে দুটি প্রধান শাখায় ভাগ করা হয়:
- সোমাটিক স্নায়ুতন্ত্র (Somatic Nervous System): দেহের ঐচ্ছিক কঙ্কাল পেশির সঞ্চালন ও ত্বকের বাহ্যিক সংবেদন নিয়ন্ত্রণ করে।
- স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্র (Autonomic Nervous System - ANS): মসৃণ পেশি, হৃদপেশি ও বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ভিসেরাল অঙ্গের অনৈচ্ছিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। এটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
- সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (Sympathetic): জরুরি ও প্রতিকূল অবস্থায় "লড়াই অথবা পলায়ন" (Fight-or-Flight) প্রতিক্রিয়া সক্রিয় করে (হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়)।
- প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (Parasympathetic): শান্ত ও বিশ্রামরত অবস্থায় "বিশ্রাম ও পরিপাক" (Rest-and-Digest) শারীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখে।
স্নায়ুতন্ত্রের আণুবীক্ষণিক গঠন (Microscopic Anatomy)
স্নায়ুকলা মূলত দুই ধরনের প্রধান কোষের সমন্বয়ে গঠিত:
১. নিউরন বা স্নায়ুকোষ (Neuron)
নিউরন হলো স্নায়ুতন্ত্রের মৌলিক গাঠনিক ও কার্যকরী একক। একটি আদর্শ নিউরন তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত:
- কোষদেহ বা সোমা (Cell Body / Perikaryon): এতে একটি স্পষ্ট নিউক্লিয়াস এবং প্রোটিন সংশ্লেষণকারী বিশেষ দানাদার আরএনএ সমৃদ্ধ 'নিসল দানা' (Nissl bodies) থাকে।
- ডেনড্রাইট (Dendrites): কোষদেহ থেকে বের হওয়া ছোট ও শাখাপ্রশাখাযুক্ত প্রবর্ধক, যা সংলগ্ন অন্যান্য নিউরন বা সংবেদী গ্রাহক থেকে স্নায়ু-উদ্দীপনা গ্রহণ করে কোষদেহে প্রেরণ করে।
- অ্যাক্সন (Axon): কোষদেহ থেকে উৎপন্ন একটি দীর্ঘ একক অক্ষেয় প্রবর্ধক, যা স্নায়বিক বার্তা দূরে সিন্যাপ্সে পৌঁছে দেয়।
- মায়েলিন আবরণী (Myelin sheath): অ্যাক্সনকে বেষ্টন করে রাখা লিপিডসমৃদ্ধ নিরোধক আবরণ, যা অ্যাক্সন বরাবর সলটেটরি কন্ডাকশন (Saltatory conduction)-এর মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সংকেত সঞ্চালনে সাহায্য করে।
- র্যানভিয়ারের পর্ব (Nodes of Ranvier): মায়েলিন আবরণীর মাঝে মাঝে থাকা অরক্ষিত নিয়মিত বিরতি।
- সিন্যাপ্স (Synapse): দুটি নিউরনের মধ্যবর্তী কার্যকরী সংযোগস্থল, যেখানে নিউরোট্রান্সমিটার (যেমন: অ্যাসিটাইলকোলিন, ডোপামিন, গ্লুটামেট) ক্ষরণের মাধ্যমে এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনে সংকেত প্রবাহিত হয়।
২. নিউরোগ্লিয়া বা গ্লিয়াল কোষ (Glial Cells)
এগুলো অ-স্নায়বিক সহায়ক কোষ, যা সংখ্যায় নিউরনের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এরা নিউরনকে পুষ্টি, অক্সিজেন, যান্ত্রিক অবলম্বন, মায়েলিন আবরণী এবং জীবাণুর বিরুদ্ধে অনাক্রম্য সুরক্ষা প্রদান করে (যেমন: অ্যাস্ট্রোসাইট, অলিগোডেনড্রোসাইট, মাইক্রোগ্লিয়া, এপেনডাইমাল কোষ ও শোয়ান কোষ)।
শারীরবৃত্তীয় সংকেত প্রবাহের প্রকৃতি
তন্তুর কাজের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে স্নায়ুকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
- সংজ্ঞাবহ বা অনুভূতিবাহী স্নায়ু (Sensory / Afferent): গ্রাহক অঙ্গ থেকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে বার্তা নিয়ে যায়।
- আজ্ঞাবহ বা চেষ্টীয় স্নায়ু (Motor / Efferent): কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে কার্যকারী অঙ্গ (পেশি বা গ্রন্থি)-তে নির্দেশ বহন করে আনে।
- মিশ্র স্নায়ু (Mixed): সংজ্ঞাবহ ও আজ্ঞাবহ—উভয় ধরনের তন্তুর সমন্বয়ে গঠিত।
রোগব্যাধি ও চিকিৎসাগত গুরুত্ব (Pathology)
স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত, জিনগত বা সংবহনজনিত জটিলতায় বিভিন্ন ব্যাধি হতে পারে:
- নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ: অ্যালঝেইমার রোগ, পারকিনসন রোগ এবং অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিস (ALS)।
- ডিমায়েলিনেটিং ও অটোইমিউন ব্যাধি: মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস ও গুলিয়ান-বারে সিন্ড্রোম।
- ভাস্কুলার ও সংক্রামক রোগ: স্ট্রোক (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তপ্রবাহ বন্ধ), মেনিনজাইটিস ও এনসেফালাইটিস।
- জিনগত ব্যাধি: অ্যাঞ্জেলম্যান সিন্ড্রোম (Angelman syndrome), হান্টিংটন ডিজিজ ইত্যাদি।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ Tortora, G. J., & Derrickson, B. (2016). Principles of Anatomy and Physiology (15th ed.). John Wiley & Sons. ISBN 978-1-119-34373-8.
