স্টিফ-পারসন সিন্ড্রোম (Stiff-Person Syndrome / SPS)

From LTRC
স্টিফ-পারসন সিন্ড্রোম (SPS)
সেরিবেলামের হিস্টোপ্যাথলজি
স্নায়ুতন্ত্রের সেরিবেলামের মাইক্রোগ্রাফ
চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় বিবরণ
চিকিৎসা ক্ষেত্র: স্নায়ুরোগবিজ্ঞান (Neurology), ইমিউনোলজি
অন্য নাম: স্টিফ-ম্যান সিন্ড্রোম, মোয়ার্শ-ভোল্টম্যান সিন্ড্রোম
প্রধান লক্ষণসমূহ: প্রগতিশীল পেশি কাঠিন্য (আড়ষ্টতা), যন্ত্রণাদায়ক পেশির আক্ষেপ (স্প্যাজম), কটিদেশীয় হাইপারলর্ডোসিস, ভারসাম্যহীনতা
জটিলতা: ঘন ঘন পড়ে যাওয়া, হাঁটার ক্ষমতা হারানো, শ্বাসকষ্ট, অ্যানজাইটি ও ফোবিয়া
কারণ: অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া (অ্যান্টি-জিএডি অ্যান্টিবডি), প্যারাoptনিওপ্লাস্টিক প্রভাব
রোগ নির্ণয়: রক্তে অ্যান্টি-GAD65 অ্যান্টিবডি টাইটার, ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি (EMG), এমআরআই
চিকিৎসা: ডায়াজেপাম/ক্লোনাজেপাম, ব্যাকলোফেন, আইভিআইজি (IVIG), প্লাজমাফেরেসিস, রিটুক্সিমাব
প্রাদুর্ভাব: প্রতি ১০ লাখে প্রায় ১–২ জন (নারীদের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি)

স্টিফ-পারসন সিন্ড্রোম (Template:Lang-en, সংক্ষেপে SPS) হলো মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি অত্যন্ত বিরল ও প্রগতিশীল অটোইমিউন স্নায়বিক ব্যাধি।[1] এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মূলত ধড় (Trunk), পেট, পিঠ এবং হাত-পায়ের কঙ্কাল পেশিগুলোতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ক্রমাগত সংকোচন ঘটে, যার ফলে পেশি অস্বাভাবিক শক্ত ও কাঠের মতো শক্ত হয়ে যায় (Muscle stiffness বা Rigidity)। এর পাশাপাশি আকস্মিক শব্দ, স্পর্শ, মানসিক চাপ বা ভয়ের প্রতিক্রিয়ায় তীব্র ও যন্ত্রণাদায়ক পেশির আক্ষেপ (Muscle spasms) সৃষ্টি হয়।

১৯৫৬ সালে মায়ো ক্লিনিকের স্নায়ুবিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক মোয়ার্শ (Frederick Moersch) এবং হেনরি ভোল্টম্যান (Henry Woltman) সর্বপ্রথম রোগটি শনাক্ত করেন এবং এর নাম দেন "স্টিফ-ম্যান সিন্ড্রোম"। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে লিঙ্গনিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নাম পরিবর্তন করে "স্টিফ-পারসন সিন্ড্রোম" রাখা হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বখ্যাত কানাডিয়ান সঙ্গীতশিল্পী সেলিন ডিওন (Céline Dion) এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন।[2]

প্রধান লক্ষণ ও ক্লিনিকাল প্রকাশভঙ্গি

লক্ষণগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরে প্রকাশ পায় এবং প্রগতিশীল রূপ নেয়:[3]

  • অক্ষীয় পেশির কাঠিন্য: মেরুদণ্ড, পিঠ ও পেটের পেশি সংকুচিত হয়ে কাঠের মতো শক্ত হয়ে থাকে। এর ফলে মেরুদণ্ডের নিম্নভাগ অতিরিক্ত ভেতরের দিকে বেঁকে যায়, যাকে 'কটিদেশীয় হাইপারলর্ডোসিস' (Lumbar hyperlordosis) বলা হয়।
  • তীব্র পেশি আক্ষেপ (Spasms): অপ্রত্যাশিত শব্দ (যেমন গাড়ির হর্ন), হঠাৎ স্পর্শ বা মানসিক উদ্বেগে পুরো শরীরের পেশি প্রচণ্ড মোচড় দিয়ে সংকুচিত হয়। এই টান এতটাই তীব্র হতে পারে যে রোগী হঠাৎ মাটিতে পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে ফেলতে পারে।
  • চলাফেরায় অক্ষমতা ও স্ট্যাচু-সদৃশ চলনভঙ্গি: পেশির নমনীয়তা নষ্ট হওয়ায় রোগী শরীর সোজা রেখে রোবটের মতো বা আড়ষ্টভাবে হাঁটেন।
  • শ্বসনক্রিয়ায় ব্যাঘাত: বুকের পাঁজর ও পেটের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়ায় ফুসফুস প্রসারিত হতে পারে না, ফলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
  • মানসিক প্রতিক্রিয়া ও ফোবিয়া: হঠাৎ আক্ষেপ ও পতনের ভয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উন্মুক্ত স্থানে যাওয়ার ভয় (Agoraphobia), বিষণ্ণতা ও তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়।

সম্ভাব্য কারণ ও প্যাথোফিজিওলজি

স্টিফ-পারসন সিন্ড্রোম মূলত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ইনহিবিটরি নিউরোট্রান্সমিটার গাবার (GABA - Gamma-Aminobutyric Acid) ঘাটতির ফলে ঘটে:

  • প্রায় ৭০–৮০% রোগীর রক্ত ও স্পাইনাল ফ্লুইডে গ্লুটামিক অ্যাসিড ডিকার্বক্সিলেজ (GAD65) এনজাইমের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার অটোঅ্যান্টিবডি (Anti-GAD antibodies) পাওয়া যায়।
  • জিএডি (GAD) এনজাইমটি গ্লুটামেটকে শান্তিদায়ক নিউরোট্রান্সমিটার 'গাবা'-তে রূপান্তরিত করে। অ্যান্টিবডি এই এনজাইম ধ্বংস করায় মস্তিষ্কে ও মেরুদণ্ডে গাবার মাত্রা কমে যায়। ফলে মোটর নিউরনগুলো অনবরত অতি-উত্তেজিত সংকেত পাঠাতে থাকে এবং পেশি সবসময় শক্ত হয়ে থাকে।
  • অন্যান্য অটোইমিউন রোগ—যেমন টাইপ-১ ডায়াবেটিস (প্রায় ৩৫% ক্ষেত্রে সহাবস্থান করে), অটোইমিউন থাইরয়েডাইটিস ও ভিটিলিগোর সাথে এর গভীর সংযোগ রয়েছে।
  • বিরল ক্ষেত্রে এটি প্যারানিওপ্লাস্টিক সিন্ড্রোম (যেমন স্তন বা ফুসফুসের টিউমারের প্রতিক্রিয়া) হিসেবেও প্রকাশ পেতে পারে (যেমন Anti-amphiphysin অ্যান্টিবডি উপস্থিতি)।

শ্রেণিবিভাগ

১. ক্লাসিক্যাল এসপিএস (Classical SPS): ধড়, কোমর ও উরুর পেশি প্রধানত আক্রান্ত হয় (অ্যান্টি-জিএডি পজিটিভ)। ২. পার্শিয়াল এসপিএস (Stiff-limb syndrome): আড়ষ্টতা মূলত একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ বা পায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। ৩. পার্ম (PERM - Progressive Encephalomyelitis with Rigidity and Myoclonus): পেশি কাঠিন্যের পাশাপাশি মস্তিষ্কের প্রদাহ, অনিয়ন্ত্রিত ঝাঁকুনি (Myoclonus) এবং স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের বিকলতাসহ দ্রুত অবনতিশীল মারাত্মক রূপ।

রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

  • অ্যান্টি-জিএডি অ্যান্টিবডি পরীক্ষা: রক্তরস ও সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডে (CSF) উচ্চ ঘনত্বের Anti-GAD65 অ্যান্টিবডির উপস্থিতি নির্ণয়।
  • ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি (EMG): বিশ্রামরত অবস্থায়ও পেশিতে স্বাভাবিক শিথিলতার পরিবর্তে ক্রমাগত মোটর ইউনিট অ্যাকটিভিটি (Continuous motor unit firing) লক্ষ্য করা।
  • অন্যান্য স্নায়ুরোগ (যেমন মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, পারকিনসনিজম, টিটেনাস) নাকচ করার জন্য মস্তিষ্কের এমআরআই ও রক্ত পরীক্ষা।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

এসপিএস নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে লক্ষণ প্রশমিত রাখা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব:

  • গাবা বর্ধক ওষুধ (GABA-enhancing drugs): পেশির খিঁচুনি কমাতে উচ্চমাত্রার ডায়াজেপাম বা ক্লোনাজেপাম (Benzodiazepines) এবং ব্যাকলোফেন (Baclofen) মুখে বা ইন্ট্রাথেকাল পাম্পের মাধ্যমে প্রয়োগ।
  • ইমিউনোমোডুলেটরি থেরাপি: ক্ষতিকর অ্যান্টিবডি কমাতে ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন (IVIG), প্লাজমাফেরেসিস (Plasmapheresis) এবং বি-কোষ বিনাশকারী বায়োলজিক ওষুধ রিটুক্সিমাব (Rituximab)।
  • ফিজিওথেরাপি: বিশেষায়িত হালকা স্ট্রেচিং, অ্যাকোয়াথেরাপি এবং হিট থেরাপি পেশির নমনীয়তা রক্ষায় সাহায্য করে (তবে অতিরিক্ত চাপ বা উদ্দীপনা পরিহার করতে হয়)।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. ↑ Darras, B. T., Jones, H. R., & Ryan, M. M. (2014). Neuromuscular Disorders of Infancy, Childhood, and Adolescence. Elsevier Science, পৃ. ১৮৮। ISBN 978-0-12-417127-5.
  2. ↑ What is stiff-person syndrome? Celine Dion reveals rare condition – The Washington Post, ২০২২।
  3. ↑ Stiff-Person Syndrome – National Institute of Neurological Disorders and Stroke (NINDS), ২০২৩।