রক্তনালী / রক্তবাহ (Blood Vessel / Blood Vessels)

From LTRC
রক্তনালী (Blood vessel)
রক্তনালীর প্রকারভেদ
ধমনি, ধমনিকা, কৈশিকজালিকা, উপশিরা ও শিরার সমন্বিত রক্ত সংবহন পথ
শারীরস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় বিবরণ
ল্যাটিন নাম: vas sanguineum (বহুবচনে: vasa sanguinea)
তন্ত্র: সংবহনতন্ত্র (Circulatory system)
প্রধান প্রকারভেদ: ধমনি, ধমনিকা (Arteriole), রক্ত কৈশিকনালী (Capillary), উপশিরা (Venule), শিরা (Vein)
মোট দৈর্ঘ্য: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে প্রায় ১,০০,০০০ কিমি (৬০,০০০ মাইল)
প্রধান কাজ: সারা দেহে রক্ত সংবহন, গ্যাসীয় বিনিময় (অক্সিজেন/কার্বন ডাই-অক্সাইড), পুষ্টি ও হরমোন পরিবহন এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ
শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া: ভ্যাসোডাইলেশন (রক্তনালী প্রসারণ) ও ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন (রক্তনালী সংকোচন)

রক্তনালী বা রক্তবাহ (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো মানবদেহ ও অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রক্ত সংবহনতন্ত্রের একটি অত্যন্ত জটিল ও সুসংবদ্ধ নলাকার পরিবহন নেটওয়ার্ক, যার মধ্য দিয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রমাগত পাম্পিং ক্রিয়ার সাহায্যে সারা শরীরে রক্ত প্রবাহিত হয়। কেন্দ্রীয় পাম্পিং অঙ্গ হিসেবে হৃৎপিণ্ড এবং সমগ্র দেহের রক্তনালীগুলো একত্রিত হয়ে একটি বদ্ধ সংবহনতন্ত্র (Closed circulatory system) গড়ে তোলে।[1]

একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে সমস্ত রক্তনালীকে (ধমনি, শিরা ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কৈশিকজালিকা) যদি এক প্রান্তে জোড়া লাগানো হয়, তবে তার মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে প্রায় **১,০০,০০০ কিলোমিটার** (প্রায় ৬০,০০০ মাইল); যা দিয়ে পৃথিবীকে বিষুবরেখা বরাবর দুইবারেরও বেশি বৃত্তাকারে পেঁচানো সম্ভব।

প্রধান প্রকারভেদ ও রক্ত সংবহন পথ

রক্তনালীগুলো গঠন ও কাজের ওপর ভিত্তি করে প্রধানত পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত:

  1. ধমনি (Arteries): হৃদযন্ত্র থেকে উচ্চ চাপে অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্ত দেহের দূরবর্তী অঙ্গ ও কোষকলায় বহনকারী পুরু প্রাচীরযুক্ত ও স্থিতিস্থাপক রক্তনালী (ব্যতিক্রম: ফুসফুসীয় ধমনি)।
  2. ধমনিকা (Arterioles): ধমনির ক্ষুদ্রতম শাখা, যা রক্তপ্রবাহকে কৈশিকনালীতে পরিচালিত করে এবং পেরিফেরাল ভাসকুলার রেজিস্ট্যান্স বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
  3. রক্ত কৈশিকনালী (Capillaries): ধমনিকা ও উপশিরার মধ্যবর্তী একক স্তরবিশিষ্ট অতিসূক্ষ্ম আণুবীক্ষণিক জালিকা। এদের পাতলা প্রাচীর ভেদ করে রক্ত এবং দেহকোষের মধ্যবর্তী টিস্যু ফ্লুইডের মধ্যে অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড ও বর্জ্য পদার্থের আণবিক বিনিময় ঘটে।
  4. উপশিরা (Venules): কৈশিকনালী থেকে ব্যবহৃত দূষিত রক্ত সংগ্রহকারী ক্ষুদ্রতম শিরা।
  5. শিরা (Veins): তুলনামূলক পাতলা প্রাচীর ও প্রশস্ত লুমেনযুক্ত রক্তনালী, যা কম চাপে দেহের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্তকে পুনরায় হৃদযন্ত্রে ফিরিয়ে আনে। রক্ত বিপরীত দিকে ফিরে যাওয়া রোধ করতে শিরার ভেতরে একমুখী কপাটিকা (Valves) থাকে (ব্যতিক্রম: ফুসফুসীয় শিরা বিশুদ্ধ রক্ত বহন করে)।

$$\text{হৃৎপিণ্ড} \rightarrow \text{ধমনি} \rightarrow \text{ধমনিকা} \rightarrow \text{কৈশিকনালী (গ্যাস ও পুষ্টি বিনিময়)} \rightarrow \text{উপশিরা} \rightarrow \text{শিরা} \rightarrow \text{হৃৎপিণ্ড}$$

কলাস্থানিক প্রাচীর গঠন (Histology)

বৃহৎ ও মাঝারি রক্তনালীগুলোর (ধমনি ও শিরা) প্রাচীর প্রধানত তিনটি সমকেন্দ্রিক স্তরে গঠিত:

  • টিউনিকা ইন্টিমা (Tunica intima): সবচেয়ে ভেতরের স্তর, যা একক স্তরের মসৃণ এন্ডোথেলিয়াম দ্বারা গঠিত; এটি রক্তের ঘর্ষণহীন প্রবাহ নিশ্চিত করে।
  • টিউনিকা মিডিয়া (Tunica media): মধ্যবর্তী স্তর, যা অনৈচ্ছিক মসৃণ পেশি ও ইলাস্টিক ফাইবার দ্বারা গঠিত। ধমনিতে এই স্তরটি অত্যন্ত পুরু ও শক্তিশালী।
  • টিউনিকা অ্যাডভান্টিশিয়া (Tunica adventitia): বাইরের স্তরের কোলাজেন ও সংযোগকারী কলা, যা নালীটিকে গঠনগত দৃঢ়তা ও সুরক্ষা দেয়।

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া

রক্তনালী শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা (Thermoregulation) এবং রক্তচাপের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে:

  • ভ্যাসোডাইলেশন (Vasodilation / রক্তনালী প্রসারণ): রক্তনালীর মসৃণ পেশি শিথিল হয়ে নালীর ব্যাস বৃদ্ধি পেলে ত্বকের উপরিভাগে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়। ফলে শরীর থেকে অতিরিক্ত তাপ বিকিরণ প্রক্রিয়ায় পরিবেশে নির্গত হয়ে দেহকে শীতল করে।
  • ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন (Vasoconstriction / রক্তনালী সংকোচন): ঠান্ডা পরিবেশে রক্তনালী সংকুচিত হয়ে ত্বকের পৃষ্ঠীয় রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়, যা শরীর থেকে অভ্যন্তরীণ তাপের অপচয় রোধ করে এবং দেহকে উষ্ণ রাখে।

ক্লিনিকাল তাৎপর্য ও রোগব্যাধি

  • অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস: ধমনির প্রাচীরে চর্বির প্লাক জমে রক্তনালী শক্ত ও সরু হয়ে যাওয়া (যার পরিণতিতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক ঘটে)।
  • উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension): ধমনিকার অতিরিক্ত সংকোচন বা স্থিতিস্থাপকতা হ্রাসের ফলে রক্তনালীর প্রাচীরে অবিরাম উচ্চ চাপ বজায় থাকা।
  • প্রান্তীয় ধমনি ব্যাধি (PAD): অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহকারী দূরবর্তী ধমনি সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া।
  • ভ্যারিকোজ ভেইন (Varicose Veins): পায়ের শিরার অভ্যন্তরীণ কপাটিকা দুর্বল হয়ে রক্ত জমে শিরা ফুলে ওঠা ও আঁকাবাঁকা হয়ে যাওয়া।
  • ভাস্কুলাইটিস: বিভিন্ন অটোইমিউন রোগের কারণে রক্তনালীর প্রাচীরে প্রদাহ সৃষ্টি হওয়া।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

বহিঃসংযোগ

Template:Commons category