যোজক কলা
যোজক কলা বা সংযোগী কলা (Template:Lang-en, Template:Lang-la) হলো প্রাণিদেহের প্রধান চার প্রকার মৌলিক কলার (আবরণী কলা, পেশিকলা ও স্নায়ুকলাসহ) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত রূপ। এই কলা বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুর মধ্যে শারীরিক সংযোগ রক্ষা করে, তাদের নির্দিষ্ট স্থানে ধরে রাখে, সুরক্ষা ও ভারবহনমূলক অবলম্বন প্রদান করে এবং অঙ্গসমূহের মধ্যবর্তী স্থানে ফাঁক পূরণ করে।[1] অধিকাংশ যোজক কলা ভ্রূণীয় মেসোডার্ম থেকে সৃষ্ট মেসেনকাইম (Mesenchyme) কোষীয় স্তর থেকে বিকশিত হয়।
১৮৩০ সালে জার্মান শারীরতত্ত্ববিদ ইয়োহানেস পিটার মুলার (Johannes Peter Müller) সর্বপ্রথম এই বিশেষ কলার জন্য "যোজক কলা" (জার্মান: Bindegewebe) শব্দটি ব্যবহার করেন।
মৌলিক গাঠনিক উপাদান
যোজক কলা প্রধানত তিনটি মৌলিক উপাদান নিয়ে গঠিত:[2]
১. বিভিন্ন প্রকার কোষ (Specialized Cells)
- ফাইব্রোব্লাস্ট (Fibroblast): যোজক কলার প্রধান ও সর্বাধিক সক্রিয় কোষ, যা তন্তু ও বহিঃকোষীয় মাতৃকা ক্ষরণ করে।
- অ্যাডিপোসাইট (Adipocyte): স্নেহ পদার্থ বা চর্বি সঞ্চয়কারী কোষ, যা তাপ কুপরিবাহী হিসেবে দেহ উষ্ণ রাখে।
- ম্যাক্রোফেজ (Macrophage): ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ক্ষতিকর জীবাণু ও মৃত কোষ ভক্ষণ করে দেহের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে।
- মাস্ট কোষ (Mast cell): প্রদাহ ও অ্যালার্জি প্রতিরোধে হিস্টামিন ও হেপারিন নিঃসরণ করে।
- শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লাজমা কোষ: অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি ও অ্যান্টিবডি তৈরিতে নিয়োজিত।
২. বহিঃকোষীয় মৌলিক পদার্থ (Ground Substance)
এটি কোষ এবং তন্তুর মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূরণকারী জেলির মতো বর্ণহীন ও সান্দ্র তরল পদার্থ, যা গ্লাইকোস্যামিনোগ্লাইকান (যেমন হায়ালুরোনিক অ্যাসিড) ও প্রোটিওগ্লাইকান দ্বারা গঠিত। এটি পুষ্টি উপাদান ও বর্জ্য পদার্থ বিনিময়ে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
৩. প্রোটিন তন্তু (Protein Fibers)
- কোলাজেন তন্তু (Collagen fibers): অত্যন্ত মজবুত ও নমনীয় সাদা তন্তু, যা কলাকে দৃঢ় টান-সহনশীলতা প্রদান করে।
- ইলাস্টিক তন্তু (Elastic fibers): ইলাস্টিন প্রোটিন দ্বারা গঠিত হলুদ বর্ণের তন্তু, যা টানলে প্রসারিত হয় এবং ছেড়ে দিলে পুনরায় পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে।
- রেটিকুলার তন্তু (Reticular fibers): সূক্ষ্ম কোলাজেন তন্তুর জালিকা, যা বিভিন্ন নরম অঙ্গের (যেমন প্লীহা ও লিম্ফ নোড) অভ্যন্তরীণ কঙ্কাল বা জালক তৈরি করে।
যোজক কলার প্রধান শ্রেণিবিভাগ
১. প্রকৃত যোজক কলা (Connective Tissue Proper)
- শিথিল যোজক কলা (Loose Connective Tissue): এতে তন্তুর সংখ্যা কম কিন্তু মৌলিক পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে।
- অ্যারিওলার কলা (Areolar tissue): ত্বকের নিচে ও অঙ্গের চারপাশে অবস্থান করে রক্তনালী ও স্নায়ুকে অবলম্বন দেয়।
- অ্যাডিপোজ কলা (Adipose tissue): চর্বি সঞ্চয় করে এবং কুশন ও তাপনিরোধক হিসেবে কাজ করে।
- রেটিকুলার কলা (Reticular tissue): অস্থিমজ্জা ও লিম্ফয়েড অঙ্গের জালিকা গঠন করে।
- ঘন যোজক কলা (Dense Connective Tissue): এতে কোলাজেন তন্তুর প্রাচুর্য বেশি থাকে।
২. বিশেষায়িত বা কঙ্কাল যোজক কলা (Specialized / Skeletal Connective Tissue)
- তরুণাস্থি (Cartilage): নমনীয় ও অর্ধকঠিন কঙ্কাল কলা (যেমন: হায়ালিন, ইলাস্টিক ও ফাইব্রোকার্টিলেজ)।
- অস্থি (Bone / Osseous tissue): ক্যালসিয়াম ও ফসফেট লবণ জমা হয়ে অত্যন্ত শক্ত ও অনমনীয় কঙ্কাল কাঠামো গঠন করে।
৩. তরল সংবহনকারী যোজক কলা (Fluid Connective Tissue)
- রক্ত (Blood): তরল রক্তরস (প্লাজমা) এবং লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা ও অণুচক্রিকা ধারণকারী সংবহন কলা।
- লসিকা (Lymph): কলা-রস থেকে উৎপন্ন স্বচ্ছ তরল, যা চর্বি পরিবহন ও অনাক্রম্যতায় কাজ করে।
প্রধান শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি
- সংযোগ ও অবলম্বন: পেশি, অস্থি, ত্বক ও আন্তরযন্ত্রীয় অঙ্গগুলোকে পরস্পরের সাথে সুদৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখা।
- যান্ত্রিক প্রতিরক্ষা: দেহের সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহকে কুশনের মতো সুরক্ষা প্রদান (যেমন মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডের মেনিনজেস পর্দা)।
- পরিবহন: রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে অক্সিজেন, হরমোন, পুষ্টি উপাদান পরিবহন এবং বর্জ্য নিষ্কাশন।
- অনাক্রম্যতা ও নিরাময়: ফ্যাগোসাইট ও লিম্ফোসাইটের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিহত করা এবং ফাইব্রোব্লাস্ট দ্বারা ক্ষতের নিরাময় সম্পন্ন করা।
চিকিৎসাগত গুরুত্ব ও রোগব্যাধি
- মারফান সিন্ড্রোম (Marfan syndrome): জেনেটিক ত্রুটির কারণে ইলাস্টিক তন্তুর প্রোটিন ফিব্রিলিন নষ্ট হয়ে যায়, ফলে অস্বাভাবিক লম্বা হাত-পা ও মহাধমনির দুর্বলতা দেখা দেয়।
- এহলার্স-ড্যানলোস সিন্ড্রোম (Ehlers-Danlos syndrome): কোলাজেন সংশ্লেষণ ব্যাহত হওয়ার ফলে অস্থিসন্ধির অস্বাভাবিক নমনীয়তা এবং ত্বক ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
- অটোইমিউন রোগ: সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমেটোসাস (SLE) ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে দেহের অনাক্রম্যতন্ত্র যোজক কলার উপাদানে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ Biga, L. M., Dawson, S., et al. (2019). Connective Tissue Supports and Protects. Anatomy & Physiology. OpenStax/Oregon State University.
- ↑ Biga, L. M., et al. (2019). Anatomy & Physiology. OpenStax.
