মেন্ডেলীয় বংশগতি

From LTRC

Template:Infobox

মেন্ডেলীয় বংশগতি (যাকে মেন্ডেলিজম-ও বলা হয়) হলো জীববিজ্ঞানে বংশগতির একটি বিশেষ ধরন বা নিয়ম। এটি ১৮৬৫ এবং ১৮৬৬ সালে গ্রেগর জোহান মেন্ডেল কর্তৃক প্রস্তাবিত সূত্রগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ১৯০০ সালে বিজ্ঞানী হুগো দ্য ভ্রিস, কার্ল করেন্স এবং এরিখ ফন চেরম্যাক স্বাধীনভাবে এই সূত্রগুলোকে পুনরাবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে উইলিয়াম বেটসন এর ব্যাপক প্রসার ঘটান। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, নির্দিষ্ট শারীরিক বা জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে একক জিনের শক্তিশালী সম্পর্ক।

ইতিহাস

মেন্ডেলীয় বংশগতির সূত্রগুলোর প্রবর্তক গ্রেগর জোহান মেন্ডেল ১৯ শতকের একজন মোরাভিয়ান সন্ন্যাসী ছিলেন। তিনি তার মঠের বাগানে মটরশুঁটি (Pisum sativum) গাছের ওপর দীর্ঘ সংকরায়ণ পরীক্ষা চালানোর পর এই ধারণাগুলো তৈরি করেন।

১৮৫৬ থেকে ১৮৬৩ সালের মধ্যে মেন্ডেল প্রায় ২৮,০০০ মটরশুঁটি গাছ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে তিনি দুটি সাধারণ সূত্র প্রদান করেন, যা বর্তমানে 'মেন্ডেলের বংশগতির সূত্র' নামে পরিচিত। তিনি তার পরীক্ষার ফলাফল "Versuche über Pflanzen-Hybriden" (উদ্ভিদ সংকরায়ণ বিষয়ক পরীক্ষা) নামক নিবন্ধে প্রকাশ করেন, যা ১৮৬৫ সালে উপস্থাপন এবং ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯০০ সালে তাঁর কাজের পুনরাবিষ্কারের পর এটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে থমাস হান্ট মর্গান মেন্ডেলের তত্ত্বকে 'ক্রোমোজোমাল বংশগতি তত্ত্বের' সাথে যুক্ত করেন, যা আধুনিক বা ধ্রুপদী জিনতত্ত্বের (Classical Genetics) ভিত্তি স্থাপন করে।

মেন্ডেলের পরীক্ষা ও মটরশুঁটি গাছের বৈশিষ্ট্য

মেন্ডেল তাঁর পরীক্ষার জন্য মটরশুঁটি গাছের নিম্নলিখিত ৭টি বৈশিষ্ট্য নির্বাচন করেছিলেন:

  1. বীজের আকার: গোলাকার বা কুঁচকানো
  2. বীজত্বকের রঙ: সাদা, ধূসর বা বাদামী (বেগুনি দাগসহ বা দাগহীন)
  3. বীজপত্রের রঙ: হলুদ বা সবুজ
  4. ফুলের রঙ: সাদা বা বেগুনি-লাল
  5. শুঁটির আকার: স্ফীত বা খাঁজযুক্ত
  6. কাঁচা শুঁটির রঙ: হলুদ বা সবুজ
  7. কাণ্ডের দৈর্ঘ্য বা উচ্চতা: লম্বা বা খাটো

মেন্ডেল প্রমাণ করেন যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো পিতা-মাতা থেকে সন্তানে কিছু নির্দিষ্ট এককের মাধ্যমে সঞ্চারিত হয়, যেগুলোকে বর্তমানে জিন (Gene) এবং অ্যালিল (Allele) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

মেন্ডেলের বংশগতির সূত্রসমূহ

মেন্ডেলের আবিষ্কারগুলো তৎকালীন প্রচলিত বংশগতি তত্ত্ব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তার মূল সূত্রগুলো হলো:

মেন্ডেলের বংশগতির সূত্রসমূহ
সূত্র সংজ্ঞা
প্রকটতা ও একরূপতার সূত্র (Law of Dominance) কিছু অ্যালিল প্রকট (Dominant) এবং কিছু প্রচ্ছন্ন (Recessive) হয়। একটি জীবে অন্তত একটি প্রকট অ্যালিল থাকলে, বাহ্যিকভাবে (ফিনোটাইপ) প্রকট বৈশিষ্ট্যটিই প্রকাশিত হয়। প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্যটি কেবল তখনই প্রকাশিত হয় যখন দুটি অ্যালিলই প্রচ্ছন্ন হয় (হোমোজাইগাস অবস্থা)।
পৃথকীকরণ সূত্র (Law of Segregation) গ্যামেট বা জননকোষ (শুক্রাণু বা ডিম্বাণু) সৃষ্টির সময় প্রতিটি জিনের অ্যালিলগুলো একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে যায়। ফলে প্রতিটি গ্যামেট যেকোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য কেবল একটি করে অ্যালিল পায়।
স্বাধীন বিন্যাস সূত্র (Law of Independent Assortment) গ্যামেট সৃষ্টির সময় দুই বা ততোধিক ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী জিনগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে একে অপরের থেকে পৃথক ও বিন্যস্ত হতে পারে। অর্থাৎ, একটি বৈশিষ্ট্যের সঞ্চারণ অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের সঞ্চারণকে প্রভাবিত করে না।

জিনোটাইপ ও ফিনোটাইপ

  • জিনোটাইপ (Genotype): একটি জীবের অভ্যন্তরীণ জিনগত গঠন, যা তার বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ধারণ করে (যেমন- TT, Tt বা tt)।
  • ফিনোটাইপ (Phenotype): জীবের বাহ্যিক বা শারীরিক প্রকাশ, যা জিনোটাইপ এবং পরিবেশের প্রভাবে তৈরি হয় (যেমন- গাছটি লম্বা নাকি খাটো)।

নন-মেন্ডেলীয় বংশগতি

মেন্ডেল স্বয়ং উল্লেখ করেছিলেন যে তার সূত্রগুলো সব ধরনের বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বাস্তবে মানুষের উচ্চতা, গায়ের রঙ বা চোখের রঙের মতো অনেক বৈশিষ্ট্য কেবল একটি জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, বরং একাধিক জিনের প্রভাবে ঘটে। এগুলোকে পলিজেনিক বৈশিষ্ট্য (Polygenic traits) বলে।

এছাড়াও অসম্পূর্ণ প্রকটতা (Incomplete dominance), কো-ডমিন্যান্স (Co-dominance) এবং মাল্টিপল অ্যালিল (Multiple alleles)-এর মতো বিষয়গুলো মেন্ডেলের সাধারণ সূত্রগুলো মেনে চলে না। জিনতত্ত্বের এই শাখাটিকে নন-মেন্ডেলীয় বংশগতি (Non-Mendelian inheritance) বলা হয়।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র


বিষয়শ্রেণী:জিনতত্ত্ব বিষয়শ্রেণী:জীববিজ্ঞান বিষয়শ্রেণী:বিজ্ঞান বিষয়শ্রেণী:sciwiki Mendelian inheritance correction type