মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন / হার্ট অ্যাটাক (Myocardial Infarction / Heart Attack)

From LTRC
মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (Heart Attack)
করোনারি ধমনি ব্লকেজ ও হার্ট অ্যাটাক
করোনারি ধমনিতে প্লাক ফেটে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন সৃষ্টি
চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় বিবরণ
চিকিৎসা ক্ষেত্র: হৃদরোগবিজ্ঞান (Cardiology), জরুরি চিকিৎসাবিজ্ঞান
অন্য নাম: অ্যাকিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (AMI), হার্ট অ্যাটাক, করোনারি থ্রম্বোসিস
প্রধান লক্ষণসমূহ: বুকে তীব্র নিষ্পেষণমূলক ব্যথা (বাম বাহু, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া), শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ঘাম, অবসাদ
জটিলতা: কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, মারাত্মক ভেন্ট্রিকুলার অ্যারিথমিয়া, কার্ডিওজেনিক শক, হার্ট ফেইলিউর
প্রধান কারণ: করোনারি ধমনি ব্যাধি (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসজনিত রক্তনালী বন্ধ হওয়া)
ঝুঁকির কারণ: উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
রোগ নির্ণয়: ১২-লিড ইসিজি (ECG), কার্ডিয়াক ট্রপোনিন রক্ত পরীক্ষা, করোনারি অ্যানজিওগ্রাফি
জরুরি চিকিৎসা: পারকিউটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন (PCI / স্টেন্টিং), আইভি থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি, ওষুধ (অ্যাসপিরিন, নাইট্রেট, হেপারিন)

মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (Template:Lang-en, সংক্ষেপে MI), যা সাধারণ মানুষের কাছে হার্ট অ্যাটাক (Heart attack) নামে সর্বাধিক পরিচিত, হলো একটি আকস্মিক ও মারাত্মক কার্ডিওভাসকুলার জরুরি অবস্থা। যখন হৃদপেশিতে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনি বা এর কোনো শাখা রক্ত জমাট বাঁধার (Thrombosis) কারণে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে যায়, তখন সংশ্লিষ্ট হৃদপেশিতে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি বা ইসকেমিয়া ঘটে এবং রক্তপ্রবাহ না পেয়ে হৃদপেশির কোষগুলো দ্রুত মৃত্যুমুখে পতিত হয় (ইনফার্কশন)।[1]

সাধারণত অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের ফলে করোনারি ধমনির প্রাচীরে জমে থাকা চর্বিযুক্ত প্লাক ফেটে গেলে তার ওপর দ্রুত রক্তের প্লাটিলেট জমে রক্তনালীর পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা (যেমন: প্রাথমিক এনজিওপ্লাস্টি বা ক্লট গলানোর ওষুধ) না দিলে হৃদপেশির অপূরণীয় ক্ষতি হয়, যা স্থায়ী কার্ডিয়াক অক্ষমতা বা তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে।[2]

এনজাইনা বনাম হার্ট অ্যাটাক

হৃদপেশিতে রক্ত সঞ্চালনের ঘাটতির তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে ব্যথার চরিত্র ভিন্ন হয়:

  • স্টেবল এনজাইনা (Stable Angina): শারীরিক পরিশ্রম, দ্রুত হাঁটা বা সিঁড়ি ওঠার সময় হৃদপেশির অক্সিজেনের চাহিদা বাড়লে বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হয়। বিশ্রাম নিলে অথবা জিহ্বার নিচে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে/ট্যাবলেট ব্যবহার করলে ৫–১০ মিনিটের মধ্যে ব্যথা উপশম হয়।
  • আনস্টেবল এনজাইনা (Unstable Angina): বিশ্রামরত অবস্থায়ও কোনো প্ররোচনা ছাড়াই আকস্মিক তীব্র বুকে ব্যথা হয় এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হয়। এটি হার্ট অ্যাটাকের পূর্ববর্তী চরম সতর্কতা সংকেত।
  • মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (হার্ট অ্যাটাক): দীর্ঘ সময় ধরে (২০ মিনিটের বেশি) বুকে অসহ্য নিষ্পেষণমূলক ব্যথা থাকে, যা বিশ্রাম বা নাইট্রোগ্লিসারিনে পুরোপুরি কমে না এবং এতে প্রকৃত হৃদপেশির কোষের মৃত্যু ঘটে।

ক্লিনিকাল লক্ষণ ও উপসর্গ

পুরুষ ও নারীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ প্রকাশের ধরনে কিছু পার্থক্য দেখা যায়:[3]

সাধারণ লক্ষণসমূহ

  • বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি: বুকের ঠিক মাঝখানে বা বাম পাশে ভারী পাথর চেপে বসার মতো বা মোচড়ানোর মতো অসহ্য ব্যথা (Crushing retrosternal chest pain)।
  • ব্যথার বিকিরণ (Radiation of Pain): ব্যথা বুক থেকে বাম বাহু, কাঁধ, ঘাড়, নিচের চোয়াল, পিঠের মধ্যভাগ অথবা পেটের উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ে।
  • শ্বাসকষ্ট (Dyspnea): ব্যথার সাথে সাথে পর্যাপ্ত শ্বাস নিতে না পারা বা দমবন্ধ অনুভূতি।
  • শরীর ঠান্ডা হয়ে প্রচুর ঘাম বের হওয়া (Cold sweats), মাথা ঘোরা ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
  • বমি বমি ভাব, বদহজম বা বুকজ্বালার মতো অনুভূতি।

নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ লক্ষণ

পুরুষদের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বুকে তীব্র ব্যথার বদলে অস্পষ্ট লক্ষণ—যেমন অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক ক্লান্তি, চোয়াল বা পিঠে অস্বস্তি, পেটের উপরের অংশে ব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং শ্বাসকষ্ট বেশি প্রাধান্য পায়। রোগীরা একে সাধারণ অ্যাসিডিটি ভেবে অবহেলা করার কারণে চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।[4]

রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

১. ১২-লিড ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG): হার্ট অ্যাটাক শনাক্তের প্রাথমিক ও দ্রুততম পরীক্ষা। এর ভিত্তিতে হার্ট অ্যাটাককে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:

  • **STEMI (ST-Elevation MI):** ইসিজিতে এসটি-সেগমেন্টের স্পষ্ট উত্থান দেখা যায়, যা করোনারি ধমনির সম্পূর্ণ ব্লকেজ নির্দেশ করে এবং তাৎক্ষণিক রিভাস্কুলারাইজেশন প্রয়োজন।
  • **NSTEMI (Non-ST-Elevation MI):** এসটি-সেগমেন্ট উত্থান হয় না, তবে টি-ওয়েভ পরিবর্তন বা এসটি ডিপ্রেশন দেখা যায় (আংশিক ব্লকেজ)।

২. কার্ডিয়াক বায়োমার্কার (Cardiac Troponin I / T): হৃদপেশির কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তে ট্রপোনিনের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ডায়াগনস্টিক রক্ত পরীক্ষা। ৩. করোনারি অ্যানজিওগ্রাফি (Coronary Angiogram): ক্যাথেটার ও রঞ্জক প্রবেশ করিয়ে এক্স-রে স্ক্যানে কোন রক্তনালীতে কত শতাংশ ব্লকেজ রয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়।[5]

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

১. জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা (MONA Protocol)

  • **Morphine:** তীব্র ব্যথা ও উদ্বেগ কমাতে ব্যথানাশক।
  • **Oxygen:** রক্তের অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯০%-এর নিচে নামলে অতিরিক্ত অক্সিজেন প্রদান।
  • **Nitroglycerin:** করোনারি রক্তনালী প্রসারিত করে রক্তপ্রবাহ বাড়াতে সাবলিঙ্গুয়াল স্প্রে বা ট্যাবলেট।
  • **Aspirin:** রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করতে তাৎক্ষণিকভাবে ৩০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়া।[6]

২. রিভাস্কুলারাইজেশন থেরাপি (Reperfusion Therapy)

  • প্রাইমারি এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্টিং (Primary PCI): STEMI রোগীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ শুরুর ৯০–১২০ মিনিটের মধ্যে বিশেষ ক্যাথেটার ও বেলুনের সাহায্যে রক্তনালীর ব্লকেজ অপসারণ করে স্থায়ীভাবে মেটালিক বা ড্রাগ-ইলিউটিং স্টেন্ট (Stent) স্থাপন করা।
  • আইভি থ্রম্বোলাইসিস (Thrombolysis): অবিলম্বে ক্যাথেটার ল্যাব সুবিধা না থাকলে জমাট রক্ত দ্রুত গলিয়ে ফেলতে স্ট্রেপ্টোকাইনেজ, অল্টেপ্লেস বা রিটেপ্লেস ইনজেকশন প্রয়োগ।
  • করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফটিং (CABG): একাধিক প্রধান রক্তনালীতে জটিল ব্লকেজ থাকলে শরীরের অন্য স্থান থেকে রক্তনালী নিয়ে বাইপাস সার্জারি করা হয়।

৩. বর্ধিত বহিরাগত কাউন্টারপালসেশন (EECP থেরাপি)

যাঁদের পুনরায় বাইপাস বা স্টেন্টিং করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অথবা ওষুধেও এনজাইনা নিয়ন্ত্রণে আসছে না, তাঁদের ক্ষেত্রে **EECP** (Enhanced External Counterpulsation) একটি নন-সার্জিক্যাল বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়:

  • এতে রোগীর পায়ের চারপাশে বিশেষ প্রেশার কাফ পরিয়ে হৃৎস্পন্দনের ডায়াস্টোলের সাথে ছন্দ মিলিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়।
  • এর ফলে করোনারি ধমনির চারপাশের সুপ্ত সমান্তরাল ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলো (Collaterals) উন্মুক্ত ও সক্রিয় হয় এবং হৃদপেশিতে প্রাকৃতিকভাবে নতুন রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায় (যাকে "ন্যাচারাল বাইপাস" বলা হয়)।

জটিলতাসমূহ

  • মারাত্মক ভেন্ট্রিকুলার ফিব্রিলেশন থেকে তাৎক্ষণিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও আকস্মিক মৃত্যু।[7]
  • পাম্পিং ক্ষমতা লোপ পেয়ে তীব্র হার্ট ফেইলিউর এবং কার্ডিওজেনিক শক।
  • হৃদপ্রাচীর বা প্যাপিলারি পেশি ফেটে যাওয়া (Myocardial rupture)।
  • ইসকেমিক স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা

  • ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সম্পূর্ণ বর্জন করা।
  • খাবারে অতিরিক্ত লবণ (দৈনিক ৫ গ্রামের কম / ১ চামচ) ও স্যাচুরেটেড চর্বি পরিহার করা।
  • সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন দৈনিক ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের শারীরিক ব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করা।
  • রক্তচাপ (< ১৩০/৮০ মিমি পারদ), রক্তে সুগার এবং কোলেস্টেরল (LDL মাত্রা) কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • খাদ্যতালিকায় সামুদ্রিক মাছ (ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ), ফলমূল, শাকসবজি ও বাদাম নিয়মিত অন্তর্ভুক্ত করা।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. ↑ National Heart, Lung, and Blood Institute. (2013). What Is a Heart Attack? *NIH*.
  2. ↑ Mehta, P. K., et al. (2014). Acute myocardial infarction: review of pathophysiology, clinical presentation, and management. *Clinical Cardiology*.
  3. ↑ National Heart, Lung, and Blood Institute. (2014). Heart Attack Symptoms. *NIH*.
  4. ↑ Heart Attack Symptoms in Women – American Heart Association.
  5. ↑ National Heart, Lung, and Blood Institute. (2013). How Is a Heart Attack Diagnosed? *NIH*.
  6. ↑ Steg, P. G., et al. (2012). ESC Guidelines for the management of acute myocardial infarction in patients presenting with ST-segment elevation. *European Heart Journal*, 33(20), 2569–2619.
  7. ↑ Heart Disease and Stroke Statistics—2015 Update. *Circulation*, 131(4), e29–e322.