মাতৃমৃত্যু / প্রসূতি মৃত্যু (Maternal Death / Maternal Mortality)
| মাতৃমৃত্যু (Maternal Death) | |
|---|---|
সন্তান প্রসবের পর মায়ের মৃত্যুর একটি ঐতিহাসিক সমাধিস্তম্ভ স্মারক (১৮৬৩) | |
| চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিবরণ | |
| চিকিৎসা ক্ষেত্র: | প্রসূতিবিজ্ঞান (Obstetrics), জনস্বাস্থ্য, গাইনিকোলজি |
| অন্য নাম: | প্রসূতি মৃত্যু, মাতৃমৃত্যুর হার (Maternal mortality) |
| সংজ্ঞা (WHO): | গর্ভাবস্থায় বা গর্ভসমাপ্তির ৪২ দিনের মধ্যে গর্ভাবস্থা বা তার ব্যবস্থাপনাজনিত কারণে নারীর মৃত্যু |
| প্রধান প্রত্যক্ষ কারণ: | প্রসবোত্তর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (PPH), গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ (প্রি-এক্লাম্পসিয়া/এক্লাম্পসিয়া), প্রসবোত্তর সংক্রমণ (Sepsis), অনিরাপদ গর্ভপাত, বাধাগ্রস্ত প্রসব |
| প্রধান পরোক্ষ কারণ: | রক্তাল্পতা, ম্যালেরিয়া, হৃদরোগ ও পেরিপার্টাম কার্ডিওমায়োপ্যাথি |
| প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান: | চরম দারিদ্র্য, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস, বাল্যবিয়ে, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, লিঙ্গ বৈষম্য |
| প্রতিরোধ ব্যবস্থা: | দক্ষ ধাত্রী বা স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা প্রসব, গর্ভনিরোধক সুবিধা, নিরাপদ গর্ভপাত, জরুরি প্রসূতি সেবা (EmOC) |
| বার্ষিক প্রাণহানি: | প্রায় ২,৮৭,০০০ নারী (২০২০ সালের বৈশ্বিক হিসাব) |
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞানুযায়ী, মাতৃমৃত্যু (Template:Lang-en বা Template:Lang-en) হলো দুর্ঘটনা বা আকস্মিক কারণ ব্যতীত গর্ভাবস্থায় কিংবা গর্ভসমাপ্তির **৪২ দিন (বা ৬ সপ্তাহ)**-এর মধ্যে গর্ভাবস্থা, গর্ভধারণের জটিলতা বা এর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কারণে কোনো নারীর মৃত্যু হওয়া।[1] গর্ভসমাপ্তির ৪২ দিন পর থেকে এক বছরের মধ্যে ঘটে যাওয়া গর্ভজনিত মৃত্যুকে "বিলম্বিত মাতৃমৃত্যু" (Late maternal death) বা প্রেগন্যান্সি-সম্পর্কিত মৃত্যু বলা হয়।[2]
বিশ্বের অধিকাংশ মাতৃমৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য। ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্বজুড়ে প্রায় **২,৮৭,০০০ জন নারী** গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছেন—যার প্রায় ৯৫ শতাংশই ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে (প্রধানত সাব-সাহারা আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায়)।[3]
পরিমাপক সূচকসমূহ (MMR)
জনস্বাস্থ্য ও প্রসূতিবিজ্ঞানে মাতৃমৃত্যু মূল্যায়নের জন্য দুটি প্রধান সূচক ব্যবহার করা হয়:[4]
- মাতৃমৃত্যুর অনুপাত (Maternal Mortality Ratio - MMR): প্রতি ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর বিপরীতে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা। এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুণগত মানের প্রধান আন্তর্জাতিক নির্দেশক:
$$\text{MMR} = \frac{\text{মোট মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা}}{\text{মোট জীবিত জন্মের সংখ্যা}} \times ১,০০,০০০$$
- মাতৃমৃত্যুর হার (Maternal Mortality Rate): প্রজননক্ষম বয়সের (১৫–৪৯ বছর) প্রতি ১,০০,০০০ নারীর মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে গর্ভজনিত কারণে মোট মৃত্যুর সংখ্যা।
মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণসমূহ
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাতৃমৃত্যুর কারণগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:[1]
১. প্রত্যক্ষ প্রসূতিজনিত কারণ (Direct Causes - প্রায় ৭৫% ক্ষেত্রে)
- প্রসূতি রক্তক্ষরণ (Obstetrical Hemorrhage): বিশেষ করে প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তপাত বা **প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ** (Postpartum Hemorrhage - PPH); যা বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর একক বৃহত্তম কারণ।
- গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত ব্যাধি: গর্ভকালীন তীব্র উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্লাম্পসিয়া এবং খিঁচুনিযুক্ত **এক্লাম্পসিয়া** (Eclampsia)।
- প্রসবোত্তর সংক্রমণ ও সেপসিস (Puerperal Sepsis): অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রসব বা প্রসবের পর জননতন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার মারাত্মক সংক্রমণ।
- বাধাগ্রস্ত বা দীর্ঘস্থায়ী প্রসব (Obstructed Labour): পেলভিসের তুলনায় শিশুর মাথা বড় হওয়া বা ভুল অবস্থানের কারণে প্রসব পথ অবরুদ্ধ হওয়া।
- অনিরাপদ গর্ভপাত (Unsafe Abortion): অদক্ষ ব্যক্তি বা অনিরাপদ পদ্ধতিতে গর্ভপাতের ফলে জরায়ু ছিঁড়ে যাওয়া বা সংক্রমণ।
- অন্যান্য প্রত্যক্ষ জটিলতা: অ্যামনিওটিক ফ্লুইড এমবোলিজম (AFE) ও জরায়ু ফেটে যাওয়া (Uterine rupture)।
২. পরোক্ষ প্রসূতিজনিত কারণ (Indirect Causes)
গর্ভাবস্থার আগেই বিদ্যমান থাকা রোগব্যাধি যা গর্ভধারণের ফলে প্রাণঘাতী রূপ নেয়:
- গুরুতর রক্তাল্পতা (Severe Anemia) ও পুষ্টিহীনতা।
- সংক্রামক ব্যাধি (যেমন ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও এইচআইভি/এইডস)।
- হৃদরোগ ও পেরিপার্টাম কার্ডিওমায়োপ্যাথি (Peripartum cardiomyopathy)।[2]
ঝুঁকিপূর্ণ নিয়ামকসমূহ (Risk Factors)
- চরম দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যসেবায় অসমতা এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাব।
- প্রত্যন্ত বা দুর্গম অঞ্চলে বসবাস এবং সময়মতো পরিবহন সুবিধার অনুপস্থিতি (তিনটি বিলম্ব বা Three Delays Model)।
- বাল্যবিয়ে ও কৈশোরে গর্ভধারণ (১৫–১৯ বছর বয়সীদের প্রসবকালীন জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি)।
- যোগ্য ডাক্তার, প্রশিক্ষিত নার্স ও দক্ষ ধাত্রীর (Skilled Birth Attendant - SBA) অভাব।
- পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের ঘাটতি।[3]
প্রতিরোধ ও বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা
অধিকাংশ প্রসবকালীন জটিলতা সময়মতো দক্ষ চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব:[5]
- দক্ষ ধাত্রী ও প্রসব সেবা: প্রতিটি প্রসব প্রশিক্ষিত ডাক্তার বা মিডওয়াইফের উপস্থিতিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সম্পন্ন করা।
- জরুরি প্রসূতি সেবা (Emergency Obstetric Care - EmOC): রক্ত সঞ্চালন, অক্সিটোসিন ইনজেকশন (PPH রোধে), ম্যাগনেসিয়াম সালফেট (এক্লাম্পসিয়া নিয়ন্ত্রণে) এবং প্রয়োজনে দ্রুত সিজারিয়ান অপারেশনের সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা।
- গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর পরিচর্যা (ANC & PNC): গর্ভাবস্থায় অন্তত ৪ থেকে ৮ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রসবের পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
- আধুনিক গর্ভনিরোধক সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-3.1) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মাতৃমৃত্যুর অনুপাত প্রতি ১ লক্ষ জীবিত জন্মে **৭০-এর নিচে** নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ৩৪% হ্রাস পেয়েছে।[3]
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ 1.0 1.1 Indicator Metadata Registry Details: Maternal mortality ratio – World Health Organization (WHO), ২০২১।
- ↑ 2.0 2.1 Pregnancy Mortality Surveillance System – Centers for Disease Control and Prevention (CDC), ২০২৩।
- ↑ 3.0 3.1 3.2 Maternal mortality Fact Sheet – World Health Organization (WHO), ২০২৪।
- ↑ Definitions of Maternal Mortality – Population Research Institute (PRI), ২০১৪।
- ↑ Maternal health – United Nations Population Fund (UNFPA), ২০২৪।
