মস্তিষ্কাঘাত / স্ট্রোক (Stroke / Cerebrovascular Accident)
মস্তিষ্কাঘাত বা স্ট্রোক (Template:Lang-en, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় Template:Lang-en বা সংক্ষেপে CVA) হলো একটি আকস্মিক ও মারাত্মক চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, যা মস্তিষ্কের রক্তনালীতে বাধার সৃষ্টি হয়ে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হলে কিংবা রক্তনালী ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কের কোষে রক্তক্ষরণ ঘটলে সৃষ্টি হয়।[1] মস্তিষ্কের নিউরনগুলো অক্সিজেন ও গ্লুকোজের জন্য নিরবচ্ছিন্ন রক্তপ্রবাহের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল; ফলে রক্ত সঞ্চালন কয়েক মিনিটের জন্য ব্যাহত হলেও আক্রান্ত অংশের মস্তিষ্কের কোষগুলো দ্রুত ধ্বংস বা মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
লক্ষণ প্রকাশের সাথে সাথে রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে মাথার নন-কনট্রাস্ট সিটি স্ক্যান (NCCT Brain) করে এটি ইসকেমিক নাকি হেমোরেজিক স্ট্রোক তা নিশ্চিত করতে হয়। যদি রক্তক্ষরণ না থাকে (ইসকেমিক স্ট্রোক), তবে রক্ত জমাট গলানোর সুনির্দিষ্ট থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি অতি দ্রুত প্রয়োগের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
প্রধান প্রকারভেদ ও প্যাথোফিজিওলজি
১. রক্ত সংবহন ঘাটতিজনিত বা ইসকেমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke)
সমগ্র স্ট্রোকের প্রায় ৮০% ঘটনা ইসকেমিক স্ট্রোকের কারণে ঘটে। এটি মূলত মস্তিষ্কের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার কারণে হয়:
- থ্রম্বোটিক স্ট্রোক (Thrombotic Stroke - প্রায় ৬০%): মস্তিষ্কের নিজস্ব ধমনিতে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসজনিত কারণে রক্তনালীর প্রাচীরে চর্বির প্লাক তৈরি হয়ে তার ওপর রক্ত জমাট বাঁধে (থ্রম্বোসিস)।[1]
- এমবোলিক স্ট্রোক (Embolic Stroke - প্রায় ২০%): শরীরের অন্য কোনো স্থান (বিশেষ করে হৃৎপিণ্ড) থেকে রক্তের জমাট টুকরো বা কোলেস্টেরলের কণা রক্তপ্রবাহে ভেসে এসে (এমবোলাই) মস্তিষ্কের সরু ধমনিতে আটকে যায়। হৃৎপিণ্ডের অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (Atrial fibrillation) বা কৃত্রিম ভালভ থাকলে এই ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।[2]
২. রক্তক্ষরণজনিত বা হেমোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke)
সমগ্র স্ট্রোকের প্রায় ২০% ক্ষেত্র রক্তনালী ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণের ফলে হয়:
- ইন্ট্রাসেরিব্রাল হেমোরেজ (Intracerebral Hemorrhage): অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কের গভীরের ক্ষুদ্র ধমনী ফেটে মস্তিষ্কের কলার ভেতরে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে।
- সাব-অ্যারাকনয়েড হেমোরেজ (Subarachnoid Hemorrhage): মস্তিষ্কের উপরিভাগের রক্তনালীর বেরিবেরির মতো অস্বাভাবিক স্ফীতি বা অ্যানিউরিজম (Aneurysm) ফেটে গিয়ে অ্যারাকনয়েড পর্দার নিচে রক্তক্ষরণ হয়।[3]
ক্লিনিকাল লক্ষণ ও উপসর্গ
মস্তিষ্কের যে অংশে রক্তপ্রবাহ বিঘ্নিত হয়, সেই অংশের নিয়ন্ত্রিত কাজগুলো নষ্ট হয়ে যায়:
- একপাশের পক্ষাঘাত (Hemiplegia / Hemiparesis): শরীরের ডান বা বাম অর্ধেকের হাত-পা সম্পূর্ণ বা আংশিক অবশ হয়ে যাওয়া।
- মুখের অসমতা (Facial Droop): হাসলে বা কথা বললে মুখের একপাশ ঝুলে যাওয়া।
- ভাষাগত সমস্যা (Aphasia / Dysarthria): কথা বলতে না পারা, জড়ানো অস্পষ্ট উচ্চারণ অথবা অন্যের কথা বুঝতে অক্ষমতা।
- দৃষ্টিশক্তির বৈকল্য: এক চোখে আকস্মিক অন্ধত্ব বা উভয় চোখের একপাশের দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়া (Hemianopia) কিংবা দ্বৈত দৃষ্টি (Diplopia)।
- ভারসাম্যহীনতা ও মাথা ঘোরা (Ataxia): সেরিবেলাম বা ব্রেনস্টেম আক্রান্ত হলে টালমাটাল হাঁটা এবং তীব্র মাথা ঘোরা।
- তীব্র মাথাব্যথা: সাব-অ্যারাকনয়েড রক্তক্ষরণের ক্ষেত্রে রোগী জীবনের সবচেয়ে তীব্র ও আকস্মিক বজ্রপাতের মতো মাথাব্যথা (Thunderclap headache), বমি ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন।
দ্রুত শনাক্তকরণ: FAST পরীক্ষা
সাধারণ মানুষ ও জরুরি স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত স্ট্রোক শনাক্ত করতে **FAST** নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়:
- **F (Face):** মুখ ঝুলে গেছে কি না (হাসতে বলা)।
- **A (Arms):** দুই হাত ওপরে তুলতে বললে এক হাত নিচে নেমে যায় কি না।
- **S (Speech):** কথা অস্পষ্ট বা জড়ানো কি না।
- **T (Time):** উপরোক্ত লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক জরুরি হাসপাতালে স্থানান্তর।
রোগ নির্ণয় পদ্ধতি
১. নন-কনট্রাস্ট হেড সিটি স্ক্যান (NCCT Brain): স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এটি রক্তক্ষরণ (হেমোরেজ) তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করে। তবে ইসকেমিক স্ট্রোকের দৃশ্য সিটি স্ক্যানে সুস্পষ্ট হতে সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।[4] ২. ব্রেন এমআরআই (MRI with DWI): ডিফিউশন-ওয়েটেড এমআরআই-এর মাধ্যমে ইসকেমিক স্ট্রোকের সূচনালগ্নেই (কয়েক মিনিটের মধ্যে) ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা যায়। ৩. ক্যারোটিড ডপলার ও সিটি অ্যানজিওগ্রাফি: ঘাড়ের ক্যারোটিড ধমনির রক্তনালী সংকুচিত হয়েছে কি না এবং মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম শনাক্তকরণ।[5] ৪. ইসিজি ও ইকোকার্ডিওগ্রাফি: হৃৎপিণ্ডে কোনো অস্বাভাবিক স্পন্দন (অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন), ভালভের সংক্রমণ বা রক্তের জমাট আছে কি না তা নির্ণয়।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
১. তাৎক্ষণিক ও জরুরি সেবা
- শ্বাসনালী উন্মুক্ত রাখা, অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৪%-এর ওপরে বজায় রাখা এবং আইসোলেটেড স্যালাইনের মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা।
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: তীব্র ইসকেমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের ক্ষতিপূরণমূলক রক্তপ্রবাহ বজায় রাখতে রক্তচাপ খুব দ্রুত কমানো নিষেধ (যতক্ষণ না তা ২২০/১২০ মিমি পারদ অতিক্রম করে)। তবে থ্রম্বোলাইসিস দেওয়ার আগে রক্তচাপ ১৮৫/১১০ মিমি পারদের নিচে রাখতে হয়।
২. ক্লট গলানোর ওষুধ (IV Thrombolysis)
ইসকেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার **৩ থেকে ৪.৫ ঘণ্টার মধ্যে** হাসপাতালে পৌঁছালে রিকম্বিন্যান্ট টিস্যু প্লাজমিনোজেন অ্যাক্টিভেটর (r-tPA বা অল্টেপ্লেস/টেনেক্টেপ্লেস) শিরায় প্রয়োগ করে জমাট রক্ত গলিয়ে ফেলা হয়।[6] এটি রক্তক্ষরণ না থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৩০% পর্যন্ত স্থায়ী অক্ষমতা কমাতে পারে।
৩. মেকানিক্যাল থ্রম্বেক্টমি (Mechanical Thrombectomy)
মস্তিষ্কের বৃহৎ কোনো ধমনী (যেমন ইন্টারনাল ক্যারোটিড বা মিডল সেরেব্রাল ধমনী) বন্ধ হয়ে গেলে বিশেষ ক্যাথেটারের সাহায্যে রক্তের ক্লটটি সরাসরি টেনে বের করে আনা হয় (লক্ষণ শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষেত্রবিশেষে কার্যকর)।
৪. পরবর্তী ঔষধভিত্তিক চিকিৎসা
- অ্যান্টিপ্লাটিলেট: অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেল রক্ত জমাট বাঁধা রোধে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োগ করা হয়।
- অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট: হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক স্পন্দনজনিত (AF) স্ট্রোকে ওয়ারফারিন, রিভারোক্সাবান বা অ্যাপিজাবান ব্যবহার করা হয়।[7]
- স্ট্যাটিন: উচ্চমাত্রার অ্যাটরভাস্ট্যাটিন রক্তনালীর ভেতরের প্রদাহ কমিয়ে প্লাক স্থিতিশীল রাখে।
৫. শল্যচিকিৎসা (Surgical Intervention)
- ক্যারোটিড ধমনি ৭০%-এর বেশি সংকুচিত হলে 'ক্যারোটিড এন্ডারটেরেক্টমি' (Carotid endarterectomy) করে প্লাক অপসারণ করা হয়।
- মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত চাপ মারাত্মক বাড়লে ক্র্যানিওটমি বা বার-হোল সার্জারির মাধ্যমে জমা রক্ত বের করে ডিকম্প্রেশন করা হয়।
৬. পুনর্বাসন থেরাপি (Rehabilitation)
- ফিজিওথেরাপি: অবশ পেশির শক্তি বৃদ্ধি ও হাঁটার স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।[8]
- স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি: কথা বলার জড়তা দূর করা এবং গিলতে কষ্ট (Dysphagia) হওয়া রোগীদের খাবার গ্রহণের প্রশিক্ষণ দেওয়া।[9]
প্রতিরোধ ব্যবস্থা
- উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের সুগার (ডায়াবেটিস) ও রক্তে অতিরিক্ত চর্বি বা কোলেস্টেরল কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা।
- ধূমপান, তামাক ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ পরিহার করা।
- নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম ও হাঁটাচলা করা এবং স্থূলতা কমানো।
- খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও প্রাণিজ চর্বি কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম ও মাছ গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলা।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ 1.0 1.1 Washington University School of Medicine. (2023). *The Washington Manual of Medical Therapeutics* (37th ed.). Lippincott Williams & Wilkins, পৃ. ৯৭৩–৯৭৫। ISBN 978-1-975190-62-0.
- ↑ Stroke Symptoms and Diagnosis – UpToDate, ২০২৩।
- ↑ Brain Bleed/Hemorrhage – Cleveland Clinic, ২০২৩।
- ↑ Ustrell-Roig, X., & Serena-Leal, J. (2007). Stroke. Diagnosis and Therapeutic Management of Cerebrovascular Disease. *Revista Española de Cardiología*, 60(7), 753–769.
- ↑ Brain Aneurysm: Causes, Symptoms & Treatment – Cleveland Clinic, ২০২৩।
- ↑ Tissue Plasminogen Activator for Acute Ischemic Stroke. *New England Journal of Medicine*, 333(24), 1581–1588 (1995).
- ↑ Kernan, W. N., et al. (2014). Guidelines for the Prevention of Stroke in Patients With Stroke and Transient Ischemic Attack. *Stroke*, 45(7), 2160–2236.
- ↑ Rehab Therapy After a Stroke – American Stroke Association, ২০২৩।
- ↑ Alberts, M. J., et al. (1992). Aspiration after stroke: lesion analysis by brain MRI. *Dysphagia*, 7(3), 170–173.
