ভার্টিব্রাল ধমনি / কশেরুকা ধমনি (Vertebral Artery / Vertebrobasilar System)
| ভার্টিব্রাল ধমনি (Vertebral artery) | |
|---|---|
গ্রীবাদেশীয় কশেরুকা দিয়ে করোটির অভ্যন্তরে ভার্টিব্রাল ধমনির ঊর্ধ্বমুখী গতিপথ | |
উভয় ভার্টিব্রাল ধমনির মিলনে ব্যাসিলার ধমনি গঠন (ত্রিমাত্রিক দৃশ্য) | |
| শারীরস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় বিবরণ | |
| ল্যাটিন নাম: | arteria vertebralis |
| উৎস: | সাবক্লেভিয়ান ধমনির (Subclavian artery) প্রথম অংশ |
| মিলন ও সমাপ্তি: | পনসের নিম্নাংশে উভয় ধমনি যুক্ত হয়ে ব্যাসিলার ধমনি (Basilar artery) গঠন করে |
| শাখাসমূহ: | অ্যান্টিরিওর স্পাইনাল ধমনি, পোস্টেরিয়র স্পাইনাল ধমনি, পিকা (PICA - পোস্টেরিয়র ইনফিরিয়র সেরিবেলার ধমনি), মেনিন্জিয়াল শাখা |
| রক্ত সরবরাহ ক্ষেত্র: | মস্তিষ্কের কাণ্ড (ব্রেনস্টেম), লঘুমস্তিষ্ক (সেরিবেলাম), মেরুরজ্জুর উপরিভাগ, গুরুমস্তিষ্কের পশ্চাৎভাগ (অক্সিপিটাল লোব) ও ভেতরের কান |
| প্রধান রোগব্যাধি: | ভার্টিব্রোব্যাসিলার ইনসাফিসিয়েন্সি (VBI), ল্যাটারাল মেডুলারি সিন্ড্রোম (ওয়ালেনবার্গ সিন্ড্রোম), পোস্টেরিয়র সার্কুলেশন স্ট্রোক, ভার্টিব্রাল আর্টারি ডিসেকশন |
ভার্টিব্রাল ধমনি বা কশেরুকা ধমনি (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো মানব সংবহনতন্ত্রের প্রধান গ্রীবাদেশীয় ধমনিজোড়, যা ক্যারোটিড ধমনির পাশাপাশি মস্তিষ্কের পশ্চাৎভাগ ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী 'পশ্চাৎ সংবহনতন্ত্র' (Posterior cerebral circulation) গঠন করে।[1]
এই ধমনি দুটি ঘাড়ের গভীর পেশি, সুষুম্নাকাণ্ড বা মেরুরজ্জুর উপরিভাগ (Spinal cord), মজ্জামুখ বা মেডুলা অবলংগাটা (Medulla oblongata), সেতু বা পনস (Pons), লঘুমস্তিষ্ক (Cerebellum) এবং গুরুমস্তিষ্কের পশ্চাৎভাগের দর্শন কেন্দ্রসমূহে (Occipital lobes) রক্ত যোগায়। ভার্টিব্রাল ও ব্যাসিলার ধমনির রক্তপ্রবাহে কোনো ব্লকেজ বা ব্যাঘাত ঘটলে দৃষ্টিহীনতা, মারাত্মক ভারসাম্যহীনতা, মাথা ঘোরা এবং প্রাণঘাতী ব্রেনস্টেম স্ট্রোক বা পক্ষাঘাত সৃষ্টি হতে পারে।
শারীরস্থানিক উৎপত্তি ও গতিপথের চারটি অংশ (Segments)
ডান ও বাম উভয় ভার্টিব্রাল ধমনি বক্ষগহ্বরের নিচে সাবক্লেভিয়ান ধমনির প্রথম অংশের পশ্চাৎ-উর্ধ্বভাগ থেকে উৎপন্ন হয়। ক্লিনিকাল ও শারীরস্থানিক বর্ণনার সুবিধার্থে এর গতিপথকে চারটি অংশে (V1 থেকে V4) ভাগ করা হয়:
- ভি১ বা প্রাক-কশেরুকীয় অংশ (V1 - Preforaminal segment): উৎপত্তি স্থল থেকে শুরু হয়ে ঘাড়ের লংগাস কলি পেশির পাশ দিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ষষ্ঠ গ্রীবাদেশীয় কশেরুকার (C6) ট্রান্সভার্স ফোরামেনে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত অংশ।
- ভি২ বা কশেরুকীয় অংশ (V2 - Foraminal segment): ধমনিটি ষষ্ঠ থেকে দ্বিতীয় গ্রীবাদেশীয় কশেরুকা (C6–C2) পর্যন্ত প্রতিটি কশেরুকার পার্শ্বীয় হাড়ের ছিদ্র বা 'ফোরামেন ট্রান্সভারসারিয়াম' (Foramen transversarium)-এর মধ্য দিয়ে উল্লম্বভাবে ওপরে ওঠে।
- ভি৩ বা উপ-অক্সিপিটাল অংশ (V3 - Suboccipital / Extrasomatic segment): দ্বিতীয় কশেরুকা (Axis) থেকে বের হয়ে ধমনিটি বাঁক নিয়ে প্রথম কশেরুকার (Atlas) ট্রান্সভার্স ফোরামেন অতিক্রম করে এবং অ্যাটলাসের পশ্চাৎ আর্চের খাঁজের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর এটি সাব-অক্সিপিটাল ট্রায়াঙ্গেল হয়ে করোটির দিকে অগ্রসর হয়।
- ভি৪ বা করোটি-অভ্যন্তরীণ অংশ (V4 - Intracranial segment): ধমনিটি করোটির তলদেশে থাকা বৃহৎ ছিদ্র অর্থাৎ মহারন্ধ্র বা ফোরামেন ম্যাগনাম (Foramen magnum) দিয়ে করোটি গহ্বরে প্রবেশ করে। এরপর এটি ডুরা ম্যাটার ও অ্যারাকনয়েড পর্দা ভেদ করে মেডুলা অবলংগাটার সম্মুখ ভাগে পৌঁছায়।
ব্যাসিলার ধমনি ও উইলিসের ধমনিচক্র গঠন
মেডুলা অবলংগাটা ও পনসের সংযোগস্থলে উভয় পাশের (ডান ও বাম) ভার্টিব্রাল ধমনি পরস্পর মিলিত হয়ে একটি একক শক্তিশালী ধমনি গঠন করে—যাকে ব্যাসিলার ধমনি (Basilar artery) বলা হয়।
- ব্যাসিলার ধমনিটি পনসের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পন্টাইন ধমনি, অ্যান্টেরিওর ইনফিরিয়র সেরিবেলার ধমনি (AICA) এবং সুপিরিয়র সেরিবেলার ধমনি (SCA) শাখা প্রদান করে।
- পরিশেষে এটি বিভক্ত হয়ে দুটি পোস্টেরিয়র সেরিব্রাল ধমনি (PCA) তৈরি করে।
- এই পোস্টেরিয়র সেরিব্রাল ধমনিগুলো পোস্টেরিয়র কমিউনিকেটিং ধমনির মাধ্যমে ইন্টারনাল ক্যারোটিড ধমনি ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়ে মস্তিষ্কের ভিত্তিমূলে বিখ্যাত সংবহন বলয় বা উইলিসের ধমনিচক্র (Circle of Willis) সম্পন্ন করে।
প্রধান শাখাসমূহ
- অ্যান্টেরিয়র ও পোস্টেরিয়র স্পাইনাল ধমনি: মেরুরজ্জু বা স্পাইনাল কর্ডের যথাক্রমে সম্মুখ দুই-তৃতীয়াংশ ও পশ্চাৎ এক-তৃতীয়াংশে রক্ত যোগায়।
- পোস্টেরিয়র ইনফিরিয়র সেরিবেলার ধমনি (PICA): ভার্টিব্রাল ধমনির বৃহত্তম শাখা। এটি মেডুলা অবলংগাটার পার্শ্বভাগ এবং লঘুমস্তিষ্কের নিচের অংশে রক্ত সরবরাহ করে।
- পশ্চাৎ মেনিন্জিয়াল শাখা: করোটির পেছনের হাড় ও ডুরা ম্যাটারে রক্ত দেয়।
রোগব্যাধি ও চিকিৎসাগত তাৎপর্য
১. ভার্টিব্রোব্যাসিলার ইনসাফিসিয়েন্সি (VBI) ও পোস্টেরিয়র সার্কুলেশন স্ট্রোক
ভার্টিব্রাল বা ব্যাসিলার ধমনিতে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসজনিত ব্লকেজ বা রক্ত জমাট বাঁধলে মস্তিষ্কের কাণ্ড ও লঘুমস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়:
- ভার্টিগো ও ভারসাম্যহীনতা (Ataxia): তীব্র মাথা ঘোরা, দাঁড়াতে বা হাঁটতে গেলে শরীর টালমাটাল হওয়া।
- দ্বৈত দৃষ্টি (Diplopia) ও দৃষ্টিহানি: একটি জিনিস দুটি দেখা কিংবা সাময়িক অন্ধত্ব।
- ড্রপ অ্যাটাক (Drop attacks): জ্ঞান না হারিয়ে হঠাৎ পা ভেঙে পড়ে যাওয়া।
- অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অবশ ভাব ও অসাড়তা (একপাশে বা উভয় পাশে)।
২. ল্যাটারাল মেডুলারি সিন্ড্রোম (Wallenberg Syndrome)
ভার্টিব্রাল ধমনি অথবা এর শাখা 'পিকা' (PICA) অবরুদ্ধ হয়ে মেডুলার পার্শ্বভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এটি ঘটে:
- মুখের একই পাশে তাপমাত্রা ও ব্যথার অনুভূতি লোপ পাওয়া এবং বিপরীত পাশের শরীরে স্পর্শ ও ব্যথাহীনতা।
- খাবার গিলতে কষ্ট (Dysphagia), স্বরভঙ্গ (Hoarseness) এবং হর্নার্স সিন্ড্রোম (Horner's syndrome)।
৩. ভার্টিব্রাল আর্টারি ডিসেকশন (Vertebral Artery Dissection)
ঘাড়ে তীব্র আঘাত, অতিরিক্ত মোচড় বা সড়ক দুর্ঘটনার ফলে ভার্টিব্রাল ধমনির অভ্যন্তরীণ প্রাচীর ছিঁড়ে গিয়ে রক্তনালীর ভেতরে রক্তক্ষরণ ঘটে। এটি তরুণদের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান স্ট্রোকের কারণ।
রোগ নির্ণয় পদ্ধতি
- সিটি ও এমআর অ্যানজিওগ্রাফি (CTA / MRA): ভার্টিব্রাল ধমনির গতিপথ, ব্লকেজ বা রক্তনালী ছিঁড়ে যাওয়া (Dissection) সুনির্দিষ্টভাবে মূল্যায়ন।
- ভার্টিব্রাল আর্টারি ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড: ঘাড়ের পেছনের রক্তপ্রবাহের দিক ও গতিবেগ নির্ণয় (সাবক্লেভিয়ান স্টিল সিন্ড্রোম শনাক্তকরণে কার্যকর)।
- ডিজিটাল সাবট্র্যাকশন অ্যানজিওগ্রাফি (DSA): ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসার পূর্বে ক্যাথেটার ভিত্তিক স্বর্ণমান পরীক্ষা।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ Gray, H. (1995). *Gray's Anatomy* (15th ed.). Barnes & Noble Books, পৃ. ৪৯৬। ISBN 0-7607-2273-0.
