পেশি (Muscles / পেশীতন্ত্র)
| পেশি (Muscles) | |
|---|---|
কঙ্কাল পেশি, মসৃণ পেশি এবং হৃদপেশির আণুবীক্ষণিক রূপরেখা | |
| শারীরস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় বিবরণ | |
| ল্যাটিন নাম: | musculus |
| অংশ: | পেশীতন্ত্র (Muscular system) |
| ভ্রূণীয় উৎপত্তি: | মেসোডার্ম (Mesoderm) |
| প্রধান প্রকারভেদ: | কঙ্কাল পেশি (ঐচ্ছিক), মসৃণ পেশি (অনৈচ্ছিক), হৃদপেশি |
| মোট সংখ্যা: | মানবদেহে প্রায় ৬৩৯ থেকে ৬৫০টি পেশি |
| কার্যকরী বৈশিষ্ট্য: | উত্তেজনাশীলতা, সংকোচনশীলতা, পরিবাহিতা ও স্থিতিস্থাপকতা |
পেশি (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো মেরুদণ্ডী ও বহু অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের ভ্রূণীয় মেসোডার্ম স্তর থেকে বিকশিত এক প্রকার বিশেষায়িত ও স্থিতিস্থাপক পেশিকলা, যা রাসায়নিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে মানবদেহের সামগ্রিক চলন ও অঙ্গসঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে। মানবদেহে প্রায় ৬৩৯ থেকে ৬৫০টি স্বতন্ত্র ঐচ্ছিক পেশি রয়েছে, যা একজন সুস্থ পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির মোট শারীরিক ওজনের প্রায় ৪০% থেকে ৫০% অংশ দখল করে। শরীরের বাহ্যিক গমনাগমন ছাড়াও অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহের কার্যক্রম—যেমন হৃদস্পন্দন, রক্ত সংবহন, খাদ্যনালীতে পেরিস্টালসিস প্রক্রিয়ায় খাবার পরিবহন, শ্বসন ও রেচন প্রক্রিয়া সচল রাখতে পেশি অপরিহার্য।[1]
পেশির প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
জীবদেহে পেশিকলা চারটি অনন্য মৌলিক শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী:
- উত্তেজনাশীলতা বা সংবেদনশীলতা (Excitability / Irritability): স্নায়বিক রাসায়নিক উদ্দীপনা (যেমন অ্যাসিটাইলকোলিন) গ্রহণ করে প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের ক্ষমতা।
- সংকোচনশীলতা (Contractility): উদ্দীপনার প্রভাবে নিজেকে বলপ্রয়োগে সংকুচিত বা খাটো করার ক্ষমতা।
- পরিবাহিতা (Conduction): পেশির কোনো নির্দিষ্ট অংশে সৃষ্টি হওয়া অ্যাকশন পটেনশিয়াল বা বৈদ্যুতিক সংকেত দ্রুত সমগ্র পেশিতন্তুতে সঞ্চালিত করার ক্ষমতা।
- স্থিতিস্থাপকতা ও প্রসারণক্ষমতা (Elasticity & Extensibility): কাজের পর কোনো ক্ষতি ছাড়াই প্রসারিত হওয়া এবং সংকোচন শেষে পুনরায় তার আদি অবস্থায় ফিরে আসার সক্ষমতা।
পেশিকলার প্রকারভেদ
গাঠনিক বৈশিষ্ট্য, অবস্থান এবং স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে পেশিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. কঙ্কাল পেশি বা ঐচ্ছিক পেশি (Skeletal / Striated Muscle)
- এই পেশিগুলো কণ্ডরা বা টেন্ডনের মাধ্যমে কঙ্কালতন্ত্রের অস্থির সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে।
- এগুলো প্রাণীর ইচ্ছানুযায়ী সংকুচিত ও প্রসারিত হয় (ঐচ্ছিক পেশি)।
- অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এতে সুস্পষ্ট গাঢ় ও হালকা রঙের ডোরাকাটা দাগ বা রেখা দেখা যায়। হাত ও পায়ের পেশি, পেটের পেশি এবং মুখের পেশি এর অন্তর্ভুক্ত।
২. মসৃণ পেশি বা অনৈচ্ছিক পেশি (Smooth / Visceral Muscle)
- রক্তনালীর প্রাচীর, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্র, শ্বাসনালী, জরায়ু এবং মূত্রাশয়ের মতো অভ্যন্তরীণ আন্তরযন্ত্রীয় (visceral) অঙ্গের দেয়ালে এই পেশি বিদ্যমান।
- এতে কোনো ডোরাকাটা দাগ থাকে না এবং এটি স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্র দ্বারা সম্পূর্ণ অনৈচ্ছিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।
৩. হৃদপেশি (Cardiac Muscle / Myocardium)
- এটি কেবল হৃৎপিণ্ডের মধ্যবর্তী প্রাচীরে অবস্থিত বিশেষায়িত অনৈচ্ছিক ডোরাকাটা পেশি।
- হৃদপেশির কোষগুলো ইন্টারক্যালেটেড ডিস্ক (Intercalated discs) নামক কাঠামোর সাহায্যে পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকে, যা পুরো হৃদযন্ত্রে ছন্দোবদ্ধ ও সমন্বিত বৈদ্যুতিক স্পন্দন সঞ্চালনে সাহায্য করে।[2]
কঙ্কাল পেশির আণুবীক্ষণিক গঠন
প্রতিটি কঙ্কাল পেশি সুশৃঙ্খল স্তরভিত্তিক যোজক কলার আবরণে সজ্জিত অসংখ্য পেশিতন্তুর (Myocytes) সমন্বয়ে গঠিত:
- এন্ডোমাইসিয়াম (Endomysium): প্রতিটি পৃথক পেশিকোষ বা পেশিতন্তুর চারপাশের সূক্ষ্ম আবরণ।
- পেরিমাইসিয়াম (Perimysium): কতগুলো পেশিতন্তুর গুচ্ছকে (Fascicle) একত্রে আবদ্ধ রাখা কোলাজেনসমৃদ্ধ যোজক কলার স্তর।
- এপিমাইসিয়াম (Epimysium): সমগ্র পেশিটিকে বাইরে থেকে আবৃত করে রাখা প্রধান আবরণী, যা অস্থির পেরিঅস্টিয়ামের সাথে টেন্ডনের মাধ্যমে যুক্ত থাকে।
- সারকোমিয়ার (Sarcomere): দুটি Z-লাইনের মধ্যবর্তী অংশ, যা পেশি সংকোচনের ক্ষুদ্রতম গাঠনিক ও কার্যকরী একক। এটি মূলত পাতলা 'অ্যাকটিন' (Actin) এবং পুরু 'মায়োসিন' (Myosin) ফিলামেন্টের স্লাইডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে।
মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেশি
- উদরীয় পেশি (Abdominal muscles): রেক্টাস অ্যাবডোমিনিস (Rectus abdominis), অবলিক পেশিসমূহ।
- নিতম্বের পেশি (Gluteal muscles): গ্লুটিয়াস ম্যাক্সিমাস (মানবদেহের বৃহত্তম পেশি)।
- উরুর পেশি: কোয়াড্রিসেপস ও হ্যামস্ট্রিং পেশিসমূহ; সারটোরিয়াস (মানবদেহের দীর্ঘতম পেশি)।
- চোয়ালের পেশি: ম্যাসিটার (Masseter - মানবদেহের সবচেয়ে শক্তিশালী চর্বণ পেশি)।
- কর্ণপেশি: স্টেপিডিয়াস (Stapedius - মানবদেহের ক্ষুদ্রতম কঙ্কাল পেশি)।
পেশি সম্পর্কিত রোগব্যাধি (Pathology)
পেশির স্বাভাবিক গঠনে বা স্নায়ু সংযোগে বিঘ্ন ঘটলে বিভিন্ন ব্যাধি সৃষ্টি হতে পারে:
- মায়োসাইটিস (Myositis): অটোইমিউন বা সংক্রমণজনিত কারণে পেশির প্রদাহ।
- মায়োপ্যাথি (Myopathy): পেশির গঠনগত বা জৈব-রাসায়নিক প্রাথমিক ত্রুটিজনিত দুর্বলতা।
- মাসকুলার ডিস্ট্রফি (Muscular Dystrophy): জিনগত ত্রুটির কারণে ক্রমাগত কঙ্কাল পেশির মারাত্মক ক্ষয়।
- পেশি অপচয় বা অ্যাট্রফি (Muscular Atrophy): দীর্ঘকাল অব্যবহার বা অপুষ্টির কারণে পেশি শুকিয়ে যাওয়া।
- টিউমার ও কর্কটরোগ: মসৃণ পেশির সৌম্য টিউমার মায়োমা (Myoma) এবং পেশিকলার ক্যান্সার র্যাবডোমায়োসারকোমা (Rhabdomyosarcoma)।
