পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ (Gastrointestinal Bleeding / GI Bleeding)

From LTRC
পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ (GI Bleeding)
আর্গন প্লাজমা কোয়াগুলেশন (APC)
অন্ননালীর ক্ষতে আর্গন প্লাজমা কোয়াগুলেশন (APC) দ্বারা রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় বিবরণ
চিকিৎসা ক্ষেত্র: গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি (Gastroenterology), জরুরি চিকিৎসা
অন্য নাম: গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ব্লিডিং (GI Bleed)
প্রধান প্রকারভেদ: ঊর্ধ্ব পরিপাকতন্ত্রীয় রক্তক্ষরণ (UGIB), নিম্ন পরিপাকতন্ত্রীয় রক্তক্ষরণ (LGIB)
লক্ষণসমূহ: রক্তবমি (হেমাটেমেসিস), আলকাতরার মতো কালো পায়খানা (মেলেনা), তাজা রক্তযুক্ত পায়খানা (হেমাটোকেজিয়া), ক্লান্তি ও রক্তস্বল্পতা
কারণ: পেপটিক আলসার, খাদ্যনালীর ভ্যারিক্স, ম্যালোরি-উইস টিয়ার, ডাইভার্টিকুলোসিস, কোলন ক্যান্সার, পাইলস
রোগ নির্ণয়: আপার জিআই এন্ডোস্কোপি, কোলোনোস্কোপি, সিটি অ্যানজিওগ্রাফি, রক্ত পরীক্ষা
জরুরি চিকিৎসা: তরল পুনর্ভরণ (আইভি স্যালাইন/রক্ত সঞ্চালন), পিপিআই (PPI), ব্যান্ড লাইগেশন, আর্গন প্লাজমা কোয়াগুলেশন (APC), হেমোক্লিপিং

পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ (Template:Lang-en বা Template:Lang-en) হলো মুখগহ্বর থেকে শুরু করে পায়ুপথ পর্যন্ত বিস্তৃত পরিপাকনালীর যেকোনো অংশ থেকে রক্তপাত হওয়ার একটি গুরুতর চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় অবস্থা। এটি স্বয়ং কোনো একক রোগ নয়, বরং পরিপাকনালীর বিভিন্ন অন্তর্নিহিত রোগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাব্য প্রাণঘাতী লক্ষণ। রক্তক্ষরণের পরিমাণ ও গতির ওপর ভিত্তি করে এর তীব্রতা ভিন্ন হতে পারে; ধীরগতির ও দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণের ফলে রোগীর দেহে মারাত্মক রক্তস্বল্পতা (Anemia), অবসাদ ও দুর্বলতা দেখা দেয়, অন্যদিকে আকস্মিক ও তীব্র রক্তক্ষরণে রক্ত সংবহনতন্ত্রে বিশৃঙ্খলা (Hypovolemic shock) তৈরি হয়ে রোগীর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।[1]

পরিপাকনালীর লিগামেন্ট অব ট্রেইটস (Ligament of Treitz)-এর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—ঊর্ধ্ব পরিপাকতন্ত্রীয় রক্তক্ষরণ (Upper GI Bleed) এবং নিম্ন পরিপাকতন্ত্রীয় রক্তক্ষরণ (Lower GI Bleed)।

প্রধান প্রকারভেদ ও উৎসসমূহ

১. ঊর্ধ্ব পরিপাকতন্ত্রীয় রক্তক্ষরণ (Upper GI Bleeding)

খাদ্যনালী, পাকস্থলী এবং ডুওডেনাম (ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ) থেকে হওয়া রক্তক্ষরণকে ঊর্ধ্ব পরিপাকতন্ত্রীয় রক্তক্ষরণ বলা হয়। মোট জিআই রক্তক্ষরণের প্রায় ৭০–৮০% ঘটনাই এই অঞ্চলে ঘটে।

  • খাদ্যনালীর কারণসমূহ:
    • খাদ্যনালীর ভ্যারিক্স (Esophageal Varices): যকৃতের সিরোসিসজনিত পোর্টাল হাইপারটেনশনের কারণে খাদ্যনালীর শিরাগুলো ফুলে ফেটে গিয়ে তীব্র রক্তক্ষরণ ঘটায়।[2]
    • ম্যালোরি-উইস সিন্ড্রোম (Mallory-Weiss tear): অতিরিক্ত বমি বা হেঁচকির চাপে খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলের শ্লেষ্মাঝিল্লি ছিঁড়ে রক্তপাত।
    • খাদ্যনালীর ক্যান্সার ও খাদ্যনালীর প্রদাহ (Esophagitis)।
  • পাকস্থলীর কারণসমূহ:
    • গ্যাস্ট্রিক পেপটিক আলসার: হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (H. pylori) সংক্রমণ বা ব্যথানাশক এনএসএআইডি (NSAIDs) ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সৃষ্ট আলসার।[1]
    • গ্যাস্ট্রিক অ্যান্ট্রাল ভাস্কুলার এক্টেসিয়া (GAVE / Watermelon Stomach): পাকস্থলীর রক্তনালীর অস্বাভাবিক স্ফীতি, যা দেখতে তরমুজের খোসার মতো ডোরাকাটা দেখায়।[3]
    • ডিউলাফয় লিশন (Dieulafoy's lesion): পাকস্থলীর প্রাচীরে জন্মগতভাবে বিকৃত ও প্রসারিত ধমনী ফেটে তীব্র রক্তক্ষরণ।[4]
  • ডুওডেনামের কারণসমূহ: ডুওডেনাল আলসার, রক্তনালী বিকৃতি এবং আওর্টো-এন্টেরিক ফিস্টুলা।

২. নিম্ন পরিপাকতন্ত্রীয় রক্তক্ষরণ (Lower GI Bleeding)

ডুওডেনাম-পরবর্তী ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র (কোলন), মলাশয় এবং পায়ুপথ থেকে হওয়া রক্তক্ষরণকে নিম্ন পরিপাকতন্ত্রীয় রক্তক্ষরণ বলা হয় (প্রায় ২০–৩০% ক্ষেত্র)।[5]

  • অর্শ বা পাইলস (Hemorrhoids) ও অ্যানাল ফিশার: মলত্যাগের সময় তাজা উজ্জ্বল লাল রক্তক্ষরণ ও তীব্র ব্যথা।
  • ডাইভার্টিকুলোসিস (Diverticulosis): বৃহদন্ত্রের প্রাচীরে সৃষ্ট অস্বাভাবিক থলি ফেটে রক্তপাত।
  • প্রদাহজনিত অন্ত্ররোগ (IBD): আলসারেটিভ কোলাইটিস ও ক্রোনস ডিজিজ।
  • কোলন ক্যান্সার ও পলিপ (Colon Cancer & Polyps): বৃহদন্ত্রের টিউমার বা পলিপ থেকে ধীরগতির ও দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ।
  • সংক্রামক কোলাইটিস (যেমন: শিগেলা, সালমোনেলা, ই. কোলাই বা অ্যামিবিয়াসিস)।

লক্ষণ ও ক্লিনিকাল প্রকাশভঙ্গি

  • হেমাটেমেসিস (Hematemesis): তাজা লাল রক্তবমি করা অথবা পাকস্থলীর অ্যাসিডের সংস্পর্শে কালচে কফির তলানির মতো বমি (Coffee-ground vomitus)।
  • মেলেনা (Melena): আলকাতরার মতো ঘন, কালো, পিচ্ছিল ও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত মলত্যাগ (সাধারণত ঊর্ধ্ব পরিপাকতন্ত্রের রক্তক্ষরণ নির্দেশ করে)।
  • হেমাটোকেজিয়া (Hematochezia): পায়ুপথ দিয়ে তাজা লাল বা মেরুন রঙের রক্তযুক্ত মল নির্গমন (সাধারণত নিম্ন পরিপাকতন্ত্রের রক্তক্ষরণ নির্দেশ করে)।
  • অদৃশ্য রক্তক্ষরণ (Occult GI bleeding): খালি চোখে দেখা যায় না এমন অল্প রক্তক্ষরণ, যা মলের ফিকাল অকাল্ট ব্লাড টেস্ট (FOBT)-এর মাধ্যমে শনাক্ত হয়।
  • শক ও রক্তচাপ পতন: মাথা ঘোরা, হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি, শুয়ে থেকে উঠলে রক্তচাপ কমে যাওয়া (Orthostatic hypotension), চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ও জ্ঞান হারানো।

রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

১. রক্ত পরীক্ষা: রক্তের সিবিসি (হিমোগ্লোবিন ও হেমাটোক্রিট মাত্রা), কোয়াগুলেশন প্রোফাইল (PT/INR), রক্তের গ্রুপ ম্যাচিং এবং রক্তে ইউরিয়া/ক্রিয়েটিনিন অনুপাত (মান ৩০-এর বেশি হলে ঊর্ধ্ব জিআই ব্লিডিং নির্দেশ করে)।[1] ২. আপার জিআই এন্ডোস্কোপি (Upper GI Endoscopy / OGD): খাদ্যনালী, পাকস্থলী ও ডুওডেনামের ভেতরের ক্ষত সরাসরি প্রত্যক্ষ করা এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদানের সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি। ৩. কোলোনোস্কোপি ও সিগময়েডোস্কোপি: মলদ্বার দিয়ে বিশেষ ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে সম্পূর্ণ বৃহদন্ত্রের রক্তপাতের উৎস শনাক্তকরণ।[6] ৪. সিটি অ্যানজিওগ্রাফি (CT Angiography): এন্ডোস্কোপিতে রক্তপাতের উৎস নিশ্চিত না হলে রক্তনালীর থ্রি-ডি ইমেজিংয়ের মাধ্যমে রক্তক্ষরণের সুনির্দিষ্ট স্থান নির্ণয়।[7]

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

১. প্রাথমিক পুনরুজ্জীবন ও জরুরি পরিচর্যা (Resuscitation)

  • শ্বাসনালী উন্মুক্ত রাখা (প্রয়োজনে এন্ডোট্রাকিয়াল ইনটিউবেশন)।
  • দুটি বৃহৎ আইভি ক্যানুলার মাধ্যমে দ্রুত আইসোলেটেড ক্রিস্টালয়েড স্যালাইন এবং প্রয়োজনে প্যাকড রেড ব্লাড সেল (রক্ত সঞ্চালন) প্রয়োগ করে রক্তচাপ স্থিতিশীল করা।[8]

২. ঔষধভিত্তিক চিকিৎসা

  • প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (PPI): উচ্চমাত্রার আইভি ওমিপ্রাজল বা প্যান্টোপ্রাজল ইনজেকশন পাকস্থলীর অ্যাসিড কমিয়ে রক্তের জমাটকে অক্ষুণ্ণ রাখে।[9]
  • ভ্যাসোকনস্ট্রিক্টর ড্রাগস: খাদ্যনালীর ভ্যারিক্সের ক্ষেত্রে অক্ট্রিওটাইড (Octreotide) বা টেরলিপপ্রেসিন পোর্টাল শিরার চাপ কমাতে প্রয়োগ করা হয়।[10]
  • অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি এবং H. pylori নির্মূলীকরণ চিকিৎসা।

৩. এন্ডোস্কোপিক ও ইন্টারভেনশনাল থেরাপি

  • ভ্যারিসিয়াল ব্যান্ড লাইগেশন (EVL): প্রসারিত খাদ্যনালীর শিরাগুলোতে রাবার ব্যান্ড পরিয়ে রক্তপাত বন্ধ করা।[2]
  • হেমোক্লিপিং (Hemoclip): এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে রক্তক্ষরণকারী ক্ষুদ্র ধমনীতে মেটালিক ক্লিপ আটকে দেওয়া।[11]
  • থার্মাল কোয়াগুলেশন ও এপিনেফ্রিন ইনজেকশন: আলসারের চারপাশে এপিনেফ্রিন পুশ করে রক্তনালী সংকুচিত করা বা তাপ প্রয়োগে রক্ত জমাট বাঁধানো।
  • আর্গন প্লাজমা কোয়াগুলেশন (APC): আয়নিত আর্গন গ্যাসের সাহায্যে রক্তনালী জমাট বাঁধিয়ে রক্তপাত রোধ করা।
  • টিপস (TIPS): অনিয়ন্ত্রিত ভ্যারিক্সের রক্তপাতে জগুলার শিরার মাধ্যমে পোর্টাল ও হেপাটিক শিরার মাঝে কৃত্রিম সংযোগ বা শান্ট স্থাপন করা।
  • অন্যান্য সমস্ত চিকিৎসায় ব্যর্থ হলে শেষ অবলম্বন হিসেবে শল্যচিকিৎসার (Surgery) মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে অপসারণ করা হয়।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. ↑ 1.0 1.1 1.2 Antunes, C., Tian, C., & Copelin II, E. L. (2025). Upper Gastrointestinal Bleeding. StatPearls Publishing. PMID 29262121.
  2. ↑ 2.0 2.1 Esophageal Varices – Cleveland Clinic.
  3. ↑ Antrectomy – Surgery Encyclopedia.
  4. ↑ al-Mishlab, T., et al. (1999). Dieulafoy's lesion: an obscure cause of GI bleeding. Journal of the Royal College of Surgeons of Edinburgh, 44(4), 222–225.
  5. ↑ Farrell, J. J., & Friedman, L. S. (2001). Gastrointestinal Bleeding in the Elderly. Gastroenterology Clinics of North America, 30(2), 377–407.
  6. ↑ Braden, B., & Caspary, W. F. (2003). Acute lower gastrointestinal hemorrhage. Diagnosis and management. Der Internist, 44(5), 533–538.
  7. ↑ Computed Tomography Angiography (CTA) – Johns Hopkins Medicine.
  8. ↑ Jairath, V., & Barkun, A. N. (2011). The Overall Approach to the Management of Upper Gastrointestinal Bleeding. Gastrointestinal Endoscopy Clinics of North America, 21(4), 657–670.
  9. ↑ Kanno, T., et al. (2022). Proton pump inhibitor treatment initiated prior to endoscopic diagnosis in upper gastrointestinal bleeding. Cochrane Database of Systematic Reviews.
  10. ↑ Cat, T. B., & Liu-DeRyke, X. (2010). Medical Management of Variceal Hemorrhage. Critical Care Nursing Clinics of North America, 22(3), 381–393.
  11. ↑ Xavier, A. T., et al. (2020). Endoscopic clipping for gastrointestinal bleeding. Annals of Gastroenterology, 33(6), 563–570.