ডার্মাটোমায়োসাইটিস (Dermatomyositis / DM)

From LTRC
ডার্মাটোমায়োসাইটিস (DM)
গোট্রনস প্যাপিউলস
আঙুলের সংযোগস্থলে ডার্মাটোমায়োসাইটিসের চারিত্রিক লক্ষণ 'গোট্রনস প্যাপিউলস'
চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় বিবরণ
চিকিৎসা ক্ষেত্র: রিউমাটোলজি (Rheumatology), ডার্মাটোলজি, নিউরোলজি
লক্ষণসমূহ: ত্বকে লালচে-বেগুনি ফুসকুড়ি (হেলিওট্রোপ র‍্যাশ), প্রক্সিমাল পেশি দুর্বলতা, গোট্রনস প্যাপিউলস, ক্লান্তি, গিলতে সমস্যা
জটিলতা: ইন্টারস্টিশিয়াল ফুসফুস রোগ (ILD), কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া, ক্যালসিনোসিস, ম্যালিগন্যান্সি (ক্যান্সার)
কারণ: অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া, জিনগত প্রবণতা (HLA-DR3), পরিবেশগত ও ভাইরাল প্রভাব
রোগ নির্ণয়: রক্ত পরীক্ষা (CK, অ্যালডোলেজ), মায়োসাইটিস অটো-অ্যান্টিবডি, ইএমজি (EMG), পেশি বায়োপসি, এমআরআই
চিকিৎসা: কর্টিকোস্টেরয়েড, ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ (মেথোট্রেক্সেট, অ্যাজাথায়োপ্রিন), আইভিআইজি (IVIG), হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন

ডার্মাটোমায়োসাইটিস (Template:Lang-en, সংক্ষেপে DM) হলো একটি বিরল ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অটোইমিউন ব্যাধি, যা মূলত মানবদেহের কঙ্কাল পেশি এবং ত্বককে আক্রমণ করে। এটি ইনফ্ল্যামেটরি মায়োপ্যাথি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি রোগ। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহে প্রধানত শরীরের নিকটবর্তী বা প্রক্সিমাল পেশিগুলোর (যেমন: কাঁধ, বাহুর উপরিভাগ ও উরু) প্রগতিশীল দুর্বলতা দেখা দেয় এবং সাথে ত্বকে চারিত্রিক লালচে বা বেগুনি বর্ণের ফুসকুড়ি (rash) প্রকাশ পায়।[1]

রোগটি শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক—উভয়ের মধ্যেই দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে একে 'জুভেনাইল ডার্মাটোমায়োসাইটিস' (JDM) বলা হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ডার্মাটোমায়োসাইটিসের সাথে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ক্যান্সারের (যেমন: ডিম্বাশয়, স্তন, ফুসফুস ও কোলন ক্যান্সার) গভীর প্যারানিওপ্লাস্টিক সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়।

প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ

১. ত্বকের পরিবর্তন ও চারিত্রিক ফুসকুড়ি

ডার্মাটোমায়োসাইটিসের ত্বকের উপসর্গগুলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও রোগনির্ণয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করে:

  • হেলিওট্রোপ র‍্যাশ (Heliotrope rash): চোখের ওপরের পাতা ও চোখের চারপাশের ত্বক ফুলে গিয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বেগুনি বা লালচে-গোলাপি বর্ণ ধারণ করে।
  • গোট্রনস সাইন ও প্যাপিউলস (Gottron's papules): হাতের আঙুলের সংযোগস্থলে (MCP এবং IP জয়েন্ট), কনুই ও হাঁটুতে লালচে-বেগুনি রঙের খসখসে ফুসকুড়ি বা স্ফীতি তৈরি হওয়া।
  • শল সাইন ও ভি-সাইন (Shawl and V-sign): কাঁধের পেছনের অংশ, পিঠের উপরিভাগ (শাল পরলে যেমন দেখায়) এবং বুকের সামনের অংশে 'ভি' (V) আকৃতির লালচে র‍্যাশ দেখা যাওয়া।
  • মেকানিকস হ্যান্ডস (Mechanic's hands): হাতের তালু ও আঙুলের পাশের ত্বক ফাটা, খসখসে ও রুক্ষ হয়ে যাওয়া।
  • ত্বকের এই র‍্যাশগুলো সূর্যালোক বা অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে তীব্র আকার ধারণ করে (Photosensitivity)।

২. পেশির দুর্বলতা

  • দুই পাশের কাঁধ, ঘাড়, বাহুর উপরিভাগ ও উরুর প্রক্সিমাল পেশিগুলো ধীরে ধীরে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • রোগী চেয়ার থেকে উঠতে, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে, চুল আঁচড়াতে বা হাত ওপরে তুলে ভারী জিনিস নামাতে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হন।
  • খাদ্যনালীর ওপরের পেশি দুর্বল হয়ে গেলে খাবার গিলতে কষ্ট (Dysphagia) হয় এবং শ্বাসনালীতে খাবার প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ে।

৩. অন্যান্য অঙ্গের জটিলতা

  • ফুসফুস: প্রায় ৩০-৪০% রোগীর ক্ষেত্রে ফুসফুসের সংযোগকারী কলায় প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে ইন্টারস্টিশিয়াল ফুসফুস রোগ (ILD) ও দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
  • ক্যালসিনোসিস (Calcinosis): বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ত্বক ও পেশিকলার নিচে ক্যালসিয়াম জমে শক্ত গুটি বা ক্যালসিফিকেশন তৈরি হয়।
  • কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া ও হৃৎপিণ্ডের পেশির প্রদাহ (মায়োকার্ডাইটিস)।

কারণ ও প্যাথোফিজিওলজি

ডার্মাটোমায়োসাইটিসের সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি উন্মোচিত না হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে এটি একটি হিউমোরাল অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া:

  • শরীরের অনাক্রম্যতন্ত্র বিভ্রান্ত হয়ে নিজস্ব ক্ষুদ্র রক্তনালী (কৈশিক জালিকা বা এন্ডোথেলিয়াম) আক্রমণ করে এবং কমপ্লিমেন্ট প্রোটিন (C5b-9 মেমব্রেন অ্যাটাক কমপ্লেক্স) সক্রিয় করে রক্তনালী ধ্বংস করে। ফলে পেশিতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে পেশিতন্তু শুকিয়ে যায় (Perifascicular atrophy)।
  • জিনগত সংবেদনশীলতা: নির্দিষ্ট মানব লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন (যেমন: HLA-DR3, HLA-DR52, HLA-DR6) জিনের উপস্থিতি এর ঝুঁকি বাড়ায়।
  • অটো-অ্যান্টিবডি: রোগীদের রক্তে অ্যান্টি-এমআই-২ (Anti-Mi-2), অ্যান্টি-এনএক্সপি-২ (Anti-NXP-2), অ্যান্টি-টিআইএফ-১-গামা (Anti-TIF-1γ) এবং অ্যান্টি-এমডিএ-৫ (Anti-MDA-5)-এর মতো মায়োসাইটিস-নির্দিষ্ট অটোঅ্যান্টিবডি (MSA) পাওয়া যায়।

রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

বোহান ও পিটার (Bohan and Peter, 1975) কর্তৃক প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী রোগ নির্ণয় করা হয়: ১. রক্ত পরীক্ষা: পেশি ধ্বংসের কারণে রক্তে ক্রিয়েটিন কাইনেজ (CK), অ্যালডোলেজ, এলডিএইচ (LDH) এবং ট্রান্সঅ্যামিনেজ এনজাইমের মাত্রা অস্বাভাবিক বেশি পাওয়া যায়। ২. ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি (EMG): সূঁচ ইলেকট্রোড প্রবেশ করিয়ে পেশির অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক স্পন্দন ও প্রদাহ শনাক্ত করা হয়। ৩. পেশি বায়োপসি (Muscle Biopsy): মাইক্রোস্কোপের নিচে পেশির পেরিফ্যাসিকুলার ক্ষয় এবং প্রদাহজনিত শ্বেত রক্তকণিকার উপস্থিতি নিশ্চিত করা। ৪. এমআরআই (MRI): পেশির সক্রিয় প্রদাহ ও শোথ (Edema) দেখতে ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং অত্যন্ত কার্যকর। ৫. ক্যান্সার স্ক্রিনিং: বিশেষ করে বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে লুকায়িত টিউমার শনাক্ত করতে সিটি স্ক্যান ও এন্ডোস্কোপি করা হয়।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

ডার্মাটোমায়োসাইটিসের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত আক্রমণ দমন করা এবং পেশির শক্তি ফিরিয়ে আনা:

  • কর্টিকোস্টেরয়েড: উচ্চ মাত্রার মুখে খাওয়ার প্রেডনিসোলন বা ইন্ট্রাভেনাস মিথাইলপ্রেডনিসোলোন প্রাথমিক প্রদাহ দ্রুত কমাতে প্রথম সারির ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ: স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে মেথোট্রেক্সেট (Methotrexate), অ্যাজাথায়োপ্রিন (Azathioprine), মাইকোফেনোলেট মোফেটিল বা রিটুক্সিমাব (Rituximab) প্রয়োগ করা হয়।
  • আইভিআইজি (IVIG): তীব্র পেশি দুর্বলতা এবং চিকিৎসায় সাড়া না দেওয়া রোগীদের জন্য ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর।
  • ত্বকের যত্ন: সরাসরি সূর্যালোক এড়িয়ে চলা, উচ্চ এসপিএফ (SPF) যুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার এবং অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল ওষুধ (যেমন: হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন) প্রয়োগ।
  • ফিজিওথেরাপি: পেশির নমনীয়তা বজায় রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদী বিকৃতি রোধে নিয়মিত পরিকল্পিত ব্যায়াম অপরিহার্য।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. ↑ Dermatomyositis – Genetic and Rare Diseases Information Center (GARD), ২০১৭।