জরায়ুগ্রীবা / সার্ভিক্স (Cervix / Cervix Uteri)

From LTRC
জরায়ুগ্রীবা (Cervix uteri)
স্ত্রী প্রজননতন্ত্রের সম্মুখ চিত্র
স্ত্রী প্রজননতন্ত্রের শারীরস্থান (১২: জরায়ুগ্রীবা বা সার্ভিক্স)
সার্ভিক্সের বহিঃমুখ
কোলপোস্কোপিতে দৃশ্যমান জরায়ুগ্রীবার বহিঃদ্বার (External os)
শারীরস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় বিবরণ
ল্যাটিন নাম: cervix uteri (অর্থ: "জরায়ুর ঘাড় বা গ্রীবা")
তন্ত্র: স্ত্রী প্রজননতন্ত্র (Female reproductive system)
অবস্থান: জরায়ুর (Uterus) সর্বনিম্নাংশের সরু নলাকার অংশ, যা যোনিপথের গভীরে উন্মুক্ত
ধমনি সরবরাহ: জরায়ু ধমনি (Uterine artery), যোনি ধমনি (Vaginal artery)
প্রধান অংশসমূহ: এক্টোসার্ভিক্স (Ectocervix), এন্ডোসার্ভাইকাল ক্যানাল, বাহ্যিক মুখ (External os) ও অভ্যন্তরীণ মুখ (Internal os)
প্রধান কাজ: যোনিপথ ও জরায়ুর মধ্যে সংযোগ রক্ষা, শুক্রাণুর পথ সুগম করা, সন্তান প্রসবের সময় প্রসারিত হওয়া এবং জরায়ুতে সংক্রমণ প্রবেশে বাধা দেওয়া
প্রধান রোগব্যাধি: জরায়ুগ্রীবা ক্যান্সার (Cervical cancer), সার্ভিসাইটিস, সার্ভাইকাল পলিপ, সার্ভাইকাল ইনকম্পিটেন্স

জরায়ুগ্রীবা বা সার্ভিক্স (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো স্ত্রী প্রজননতন্ত্রে জরায়ুর সবচেয়ে নিচের সরু, স্থিতিস্থাপক ও নলাকার গ্রীবাংশ; যা সরাসরি যোনিপথের (Vagina) গভীরে একটি বোতাম বা স্ফীতির মতো প্রবিষ্ট থাকে। ল্যাটিন শব্দ Cervix uteri-এর আক্ষরিক অর্থ "জরায়ুর ঘাড় বা গ্রীবা"।

শারীরস্থানিক দিক থেকে জরায়ুগ্রীবা যোনিপথ এবং জরায়ু গহ্বরের (Uterine cavity) মধ্যে একটি কার্যকর প্রবেশদ্বার বা সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করে। স্বাভাবিক সময়ে এটি একটি ঘন প্রতিরক্ষামূলক শ্লেষ্মা (Cervical mucus) ক্ষরণ করে ব্যাক্টেরিয়া ও সংক্রমণকে জরায়ুর ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ডিম্বস্ফোটনের (Ovulation) সময় এই শ্লেষ্মা পাতলা ও তরল হয়ে শুক্রাণুর চলাচলের পথ সুগম করে এবং স্বাভাবিক সন্তান প্রসবকালে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত (প্রায় ১০ সেমি পর্যন্ত ডাইলেশন) হয়ে গর্ভস্থ সন্তানকে বাইরে আসার পথ তৈরি করে দেয়।

শারীরস্থানিক গঠন ও বিভাগসমূহ

একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জরায়ুগ্রীবা গড়ে প্রায় **৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ** এবং **২.৫ সেন্টিমিটার চওড়া** একটি ডিম্বাকৃতির মাংসল গঠন। এর প্রধান অংশগুলো নিচে বর্ণিত হলো:

১. এক্টোসার্ভিক্স বা বহিঃগ্রীবা (Ectocervix)

জরায়ুগ্রীবার যে উত্তল অংশটি সরাসরি যোনিপথের ভেতরে প্রক্ষিপ্ত থাকে এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞগণ স্পেকুলাম (Speculum) পরীক্ষার মাধ্যমে খালি চোখে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, তাকে এক্টোসার্ভিক্স বলে। এর উপরিভাগ মসৃণ এবং এর কেন্দ্রে একটি ছিদ্র বা বাহ্যিক মুখ অবস্থিত।

বাহ্যিক মুখ বা এক্সটার্নাল অস (External Os)

এক্টোসার্ভিক্সের মধ্যস্থলে অবস্থিত ছিদ্রাকার পথকে বাহ্যিক মুখ (External os) বলা হয়। নারীর বয়স, হরমোনের প্রভাব এবং প্রসবের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে এর আকৃতি পরিবর্তিত হয়:

  • নালিপ্যারাস নারী (যিনি যোনিপথে সন্তান প্রসব করেননি): বাহ্যিক মুখটি আকারে ছোট, মসৃণ ও বৃত্তাকার ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো দেখায়।
  • মাল্টিপ্যারাস নারী (যিনি যোনিপথে এক বা একাধিক সন্তান প্রসব করেছেন): জরায়ুগ্রীবা কিছুটা চ্যাপ্টা ও পুরু হয় এবং বাহ্যিক মুখটি অনুভূমিক চিড় বা ফাটলের মতো (Transverse slit) প্রশস্ত আকার ধারণ করে।

২. এন্ডোসার্ভাইকাল ক্যানাল বা গ্রীবা নালী (Endocervical Canal)

বাহ্যিক মুখ (External os) থেকে শুরু হয়ে জরায়ু গহ্বরের তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত সরু অভ্যন্তরীণ নালীটিকে এন্ডোসার্ভাইকাল ক্যানাল বলা হয়। প্রজননক্ষম বয়সে এর ব্যাস চ্যাপ্টা অবস্থায় প্রায় ৭ থেকে ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই নালীর ভেতরের গ্রন্থিকোষগুলো ঋতুচক্রের বিভিন্ন পর্বে হরমোনের তারতম্যের সাথে সংগতি রেখে বিভিন্ন ঘনত্বের সার্ভাইকাল মিউকাস তৈরি করে।

৩. অভ্যন্তরীণ মুখ বা ইন্টারনাল অস (Internal Os)

এন্ডোসার্ভাইকাল ক্যানালের ঊর্ধ্বতম যে সংকীর্ণ বিন্দুটি সরাসরি প্রধান জরায়ু গহ্বরে (Uterine cavity) উন্মুক্ত হয়, তাকে অভ্যন্তরীণ মুখ বা ইন্টারনাল অস বলা হয়।

কলাস্থানিক গঠন ও ট্রান্সফরমেশন জোন (Histology)

জরায়ুগ্রীবার হিস্টোলজিতে দুটি স্বতন্ত্র ধরণের কোষকলা দেখা যায়:

  • এক্টোসার্ভিক্স: অ-কেরাটিনযুক্ত বহুস্তরবিশিষ্ট চ্যাপ্টা আবরণী কলা (Non-keratinized stratified squamous epithelium) দ্বারা আবৃত।
  • এন্ডোসার্ভিক্স: একক স্তরের স্তম্ভাকার শ্লেষ্মা-নিঃসারী গ্রন্থিময় আবরণী কলা (Simple columnar epithelium) দ্বারা গঠিত।
  • স্কোয়ামো-কলামনার জংশন (SCJ) ও ট্রান্সফরমেশন জোন (Transformation Zone): এই দুই ধরণের এপিথেলিয়ামের মিলনস্থলকে রূপান্তর অঞ্চল বা ট্রান্সফরমেশন জোন বলা হয়। কোষের মেটাপ্লাশিয়ার কারণে এই অঞ্চলটি হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) সংক্রমণ এবং ক্যান্সারের রূপান্তরের প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল।

ক্লিনিকাল তাৎপর্য ও রোগব্যাধি

১. জরায়ুগ্রীবা ক্যান্সার (Cervical Cancer)

বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশসমূহে নারীদের অন্যতম প্রধান মারাত্মক ক্যান্সার। এর প্রায় ৯৯% ক্ষেত্র হাই-রিস্ক **হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV)** সংক্রমণের (প্রধানত স্ট্রেন ১৬ ও ১৮) সাথে সরাসরি যুক্ত।

  • স্ক্রিনিং: নিয়মিত **প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষা (Pap smear)** এবং এইচপিভি ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ক্যান্সার-পূর্ব ক্ষতের (CIN) প্রাথমিক অবস্থাতেই এটি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।
  • প্রতিরোধ: প্রজননক্ষম বয়সের শুরুতে কিশোরীদের এইচপিভি টিকা (HPV Vaccine) প্রদান এর সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধক।

২. সার্ভিসাইটিস (Cervicitis)

জরায়ুগ্রীবার অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক অংশে প্রদাহ বা সংক্রমণ। এটি সাধারণত ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া, ট্রাইকোমোনাস বা হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের মতো যৌনবাহিত সংক্রমণের (STI) কারণে ঘটে। এর লক্ষণ হিসেবে দুর্গন্ধযুক্ত যোনিস্রাব, রক্তপাত ও শ্রোণীদেশে ব্যথা হতে পারে।

৩. সার্ভাইকাল ইনকম্পিটেন্স (Cervical Incompetence)

গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ভ্রূণের ওজনের চাপে জরায়ুগ্রীবার মুখ সময়ের আগেই অকালে খুলে যাওয়া বা শিথিল হয়ে যাওয়া; যার ফলে অকাল প্রসব বা গর্ভপাত ঘটতে পারে। চিকিৎসায় এই মুখটি সাময়িকভাবে সেলাই করে আটকে রাখা হয়—যাকে সার্ভাইকাল সারক্লেজ (Cervical cerclage) বলা হয়।

৪. সার্ভাইকাল পলিপ ও একট্রোপিয়ন

জরায়ুগ্রীবার শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির অতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে নির্দোষ পলিপ তৈরি হতে পারে, যা শারীরিক মিলনের পর মৃদু রক্তপাতের কারণ হতে পারে।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র


বহিঃসংযোগ