গুলিয়ান-বারে সিন্ড্রোম (Guillain-Barré syndrome / GBS)

From LTRC
গুলিয়ান-বারে সিন্ড্রোম (GBS)
স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষা
জিবিএস রোগীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ও শ্বসনপেশির শক্তি পরিমাপে ব্যবহৃত স্পাইরোমেট্রি
চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় বিবরণ
চিকিৎসা ক্ষেত্র: স্নায়ুরোগবিজ্ঞান (Neurology)
প্রতিশব্দ: লন্ড্রির প্যারালাইসিস, পোস্ট-ইনফেকশাস পলিনিউরাইটিস
লক্ষণসমূহ: দুই পায়ে ও হাতে অসাড়তা বা ঝিঁঝিঁ ধরা, ঊর্ধ্বমুখী পেশি দুর্বলতা (Ascending paralysis), শ্বাসকষ্ট
জটিলতা: শ্বসনপেশি বিকলতা, কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া, অনিয়মিত রক্তচাপ
কারণ: অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া (ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাল সংক্রমণের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া)
রোগ নির্ণয়: স্নায়ু পরিবাহিতা পরীক্ষা (NCS), লাম্বার পাঙ্কচার (CSF পরীক্ষা), ইএমজি (EMG)
চিকিৎসা: ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন (IVIG), প্লাজমাফেরেসিস (Plasmapheresis), সহায়ক ভেন্টিলেশন
পুনরুদ্ধার: কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর

গুলিয়ান-বারে সিন্ড্রোম (Template:Lang-en, সংক্ষেপে GBS) হলো মানবদেহের অনাক্রম্যতন্ত্রের (immune system) ত্রুটিজনিত একটি তীব্র ও দ্রুত বর্ধনশীল অটোইমিউন স্নায়বিক ব্যাধি, যা মূলত প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রকে (peripheral nervous system) আক্রমণ করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজস্ব প্রান্তীয় স্নায়ুকোষের চারপাশের সুরক্ষাকারী মায়েলিন আবরণী (myelin sheath) বা স্নায়ু অ্যাক্সনকে ধ্বংস করে ফেলে। এর ফলে মস্তিষ্ক থেকে পেশিতে বৈদ্যুতিক সংকেত চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং পা ও হাত থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ঊর্ধ্বমুখী তীব্র পেশি দুর্বলতা ও পক্ষাঘাত (Ascending paralysis) ছড়িয়ে পড়ে।[1]

১৯১৬ সালে ফরাসি স্নায়ুবিশেষজ্ঞ জর্জেস গুলিয়ান (Georges Guillain), জঁ আলেকজান্দ্রে বারে (Jean Alexandre Barré) এবং অঁদ্রে স্ত্রোল (André Strohl) যৌথভাবে এই রোগটির শারীরতাত্ত্বিক রূপরেখা প্রকাশ করেন।

রোগের লক্ষণ ও প্রকাশভঙ্গি

লক্ষণগুলো সাধারণত কোনো মৃদু ব্যাকটেরিয়াল বা ভাইরাল সংক্রমণের কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর হঠাৎ প্রকাশ পায় এবং কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে তীব্র রূপ নেয়:[2]

  • প্রাথমিক সংবেদনশীল লক্ষণ: পায়ের পাতা, গোড়ালি ও হাতের আঙুলে সুচ ফোটার মতো অনুভূতি (ঝিঁঝিঁ ধরা বা Paresthesia), অসাড়তা এবং কোমরে তীব্র পেশিব্যথা।
  • ঊর্ধ্বমুখী পেশি দুর্বলতা: দুর্বলতা প্রথমে দুই পায়ে সমানভাবে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে উরু, হাত, বুক ও মুখের পেশিতে ছড়িয়ে পড়ে। রোগী হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারায় বা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে অক্ষম হয়।
  • মুখমণ্ডল ও ক্র্যানিয়াল স্নায়ু দুর্বলতা: মুখের পেশি বেঁকে যাওয়া (Facial palsy), কথা জড়িয়ে যাওয়া, খাদ্য চর্বণ বা গিলতে সমস্যা এবং চোখের পাতা নাড়াতে অসুবিধা।
  • স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের বৈকল্য (Dysautonomia): হৃদস্পন্দনের মারাত্মক অনিয়ম (arrhythmia), রক্তচাপের আকস্মিক ওঠানামা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং মূত্রাশয় নিয়ন্ত্রণে সমস্যা।

সম্ভাব্য কারণ ও প্যাথোফিজিওলজি

জিবিএস কোনো সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটি সাধারণত শরীরে হওয়া অন্য কোনো সংক্রমণের অ্যান্টিবডির সাথে স্নায়ুর গঠনের আণবিক মিল থাকার কারণে (Molecular mimicry) সৃষ্টি হয়:

  • ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ: দূষিত পানি ও আধা-সেদ্ধ মাংস গ্রহণের মাধ্যমে সংক্রমিত Campylobacter jejuni ব্যাকটেরিয়া জিবিএসের অন্যতম প্রধান কারণ।
  • ভাইরাস সংক্রমণ: সাইটোমেগালোভাইরাস (CMV), এপস্টাইন-বার ভাইরাস (EBV), জিকা ভাইরাস, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং কোভিড-১৯ সংক্রমণ।
  • বিরল ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা বিশেষ টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অনাক্রম্যতন্ত্র বিভ্রান্ত হয়ে স্নায়ুতে আক্রমণ চালাতে পারে।

জটিলতাসমূহ

  • শ্বাসযন্ত্রের পক্ষাঘাত: প্রায় ১৫–২৫% রোগীর ক্ষেত্রে ফুসফুস ও মধ্যচ্ছদার (Diaphragm) শ্বসনপেশি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে জরুরি ভিত্তিতে রোগীকে লাইফ সাপোর্ট বা যান্ত্রিক ভেন্টিলেশনে (ICU mechanical ventilation) স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়।
  • রক্ত জমাট বাঁধা (Deep Vein Thrombosis), ফুসফুসে রক্তক্ষরণ এবং দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার ফলে বেডসোর (চাপজনিত ক্ষত)।

রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

১. স্নায়ু পরিবাহিতা পরীক্ষা (NCS / EMG): ত্বকে স্বল্পমাত্রার বৈদ্যুতিক সংকেত দিয়ে স্নায়ুর পরিবাহিতা গতিবেগ মাপা হয়; মায়েলিন ধ্বংস হলে সংকেতের গতি অত্যন্ত ধীর হয়ে যায়। ২. লাম্বার পাঙ্কচার (CSF পরীক্ষা): মেরুদণ্ডের নিম্নাংশ থেকে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সংগ্রহ করা হয়। জিবিএস রোগীদের ক্ষেত্রে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও প্রোটিনের মাত্রা অস্বাভাবিক বেশি পাওয়া যায় (Albuminocytological dissociation)। ৩. এমআরআই (MRI): মেরুদণ্ডের মূল স্নায়ুমূলের প্রদাহ পর্যবেক্ষণ করতে এবং অন্যান্য জটিল রোগ (যেমন স্ট্রোক বা মায়োসাইটিস) নাকচ করতে ব্যবহৃত হয়।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

জিবিএস একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। লক্ষণ প্রকাশের সাথে সাথে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করতে হয়:

  • ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন (IVIG): সুস্থ রক্তদাতাদের রক্তরস থেকে প্রক্রিয়াজাত অ্যান্টিবডি ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরার ভেতর প্রয়োগ করা হয়, যা স্নায়ু আক্রমণকারী ক্ষতিকর অটো-অ্যান্টিবডিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
  • প্লাজমাফেরেসিস (Plasmapheresis): মেশিনের সাহায্যে রোগীর রক্তরস ফিল্টার করে আক্রমণাত্মক ক্ষতিকর প্রোটিন ও অটো-অ্যান্টিবডি অপসারিত করে পুনরায় রক্ত শরীরে প্রবেশ করানো হয়।
  • সহায়ক ও নিবিড় পরিচর্যা: নিয়মিত স্পাইরোমেট্রি দিয়ে ফুসফুসের ক্ষমতা নজরদারি করা, হার্ট রেট ও রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ এবং নিউরো-ফিজিওথেরাপি পরিচালনা করা।

পূর্বাভাস ও আরোগ্য লাভ

সঠিক ও দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে প্রায় ৮০–৮৫% রোগী সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে স্নায়ুর মায়েলিন পুনরায় গঠিত হতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বিশ্বজুড়ে মোট আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৫–৮% ক্ষেত্রে তীব্র জটিলতার কারণে প্রাণহানি ঘটতে পারে।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. ↑ Guillain–Barré Syndrome Fact Sheet – National Institute of Neurological Disorders and Stroke (NINDS), ২০১৬।
  2. ↑ Ferri, F. F. (2016). Ferri's Clinical Advisor 2017: 5 Books in 1. Elsevier Health Sciences, পৃ. ৫২৯। ISBN 9780323448383.