গুরুমস্তিষ্ক / সেরেব্রাম (Cerebrum / বড় মস্তিষ্ক)
| গুরুমস্তিষ্ক (Cerebrum) | |
|---|---|
মানব মস্তিষ্কের বিভিন্ন লোব ও প্রধান কাঠামোর রূপরেখা | |
গুরুমস্তিষ্কের প্রাইমারি মোটর কর্টেক্স ও সোমাটোসেন্সরি কর্টেক্স | |
| শারীরস্থানিক বিবরণ | |
| ল্যাটিন নাম: | cerebrum |
| অংশ: | কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র / অগ্রমস্তিষ্ক (Telencephalon / Forebrain) |
| গঠন: | দুটি সেরেব্রাল গোলার্ধ (সেরেব্রাল হেমিস্ফিয়ার) এবং কর্পাস ক্যালোসাম |
| প্রধান লোবসমূহ: | ফ্রন্টাল লোব, প্যারাইটাল লোব, টেম্পোরাল লোব এবং অক্সিপিটাল লোব |
| কলাস্থানিক স্তর: | বহিস্থ ধূসর পদার্থ (সেরেব্রাল কর্টেক্স) ও অভ্যন্তরীণ শ্বেত পদার্থ |
| রক্ত সংবহন: | ইন্টারনাল ক্যারোটিড ধমনি ও ভার্টিব্রাল ধমনি (উইলিসের বৃত্ত) |
| প্রধান কাজ: | চিন্তা, বুদ্ধি, স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি, পঞ্চইন্দ্রিয়ের সংবেদন গ্রহণ ও ঐচ্ছিক পেশিসঞ্চালন |
গুরুমস্তিষ্ক বা সেরেব্রাম (Template:Lang-la, Template:Lang-en), যা কথ্যভাষায় অনেকসময় বড় মস্তিষ্ক নামে অভিহিত হয়, হলো মানব ও উচ্চতর মেরুদণ্ডী প্রাণীদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান ও বৃহত্তম অংশ। সমগ্র মস্তিষ্কের প্রায় ৮৫% স্থান দখল করে থাকা এই অংশটি মানুষের উচ্চতর জ্ঞানীয় চেতনা, যৌক্তিক বিচারবুদ্ধি, পরিকল্পনা, স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানসিক অনুভূতি এবং বাক্যগঠন নিয়ন্ত্রণ করে।[1] চোখ, কান, নাক, জিহ্বা এবং ত্বকের মতো পঞ্চইন্দ্রিয় থেকে সংগৃহীত যাবতীয় স্নায়বিক সংবেদন সংজ্ঞাবহ স্নায়ু ও থ্যালামাসের মাধ্যমে গুরুমস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট কর্টেক্স অঞ্চলে পৌঁছে পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধিতে রূপান্তরিত হয়।
মানব মস্তিষ্ক করোটির অস্থিময় আবরণের ভেতরে সুরক্ষিত থাকে এবং বাইরে থেকে তিনটি প্রতিরক্ষামূলক ঝিল্লি বা মেনিনজেস (দৃঢ় ডুরা মেটার, মধ্যবর্তী অ্যারাকনয়েড মেটার এবং রক্তনালীসমৃদ্ধ পিয়া মেটার) দ্বারা আবৃত থাকে। অ্যারাকনয়েড ও পিয়া মেটারের মধ্যবর্তী সাব-অ্যারাকনয়েড স্থানে সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) প্রবাহিত হয়ে মস্তিষ্ককে পুষ্টি যোগায় ও আকস্মিক আঘাত থেকে রক্ষা করে।
শারীরস্থানিক গঠন ও লোবসমূহ
গুরুমস্তিষ্ক অনুদৈর্ঘ্য ফাটল (Longitudinal fissure) দ্বারা দুটি সমান সেরেব্রাল গোলার্ধে (Cerebral hemispheres) বিভক্ত থাকে। এই গোলার্ধ দুটি প্রায় ২০ কোটি স্নায়ুতন্তুর শক্তিশালী সেতু কর্পাস ক্যালোসাম (Corpus callosum)-এর মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকে। প্রতিটি গোলার্ধের বহির্ভাগে থাকে নিউরনের কোষদেহ দিয়ে গঠিত ভাঁজযুক্ত ধূসর পদার্থ (সেরেব্রাল কর্টেক্স) এবং ভেতরের দিকে থাকে মায়েলিনযুক্ত স্নায়ুতন্তুর শ্বেত পদার্থ।
প্রতিটি সেরেব্রাল গোলার্ধ প্রধান খাঁজগুলোর (সালকাস) ভিত্তিতে চারটি প্রধান লোবে বিভক্ত:[2]
১. ফ্রন্টাল লোব (Frontal Lobe / ললাট ভাগ)
- মস্তিষ্কের একেবারে সামনের অংশ, যা সেন্ট্রাল সালকাস দ্বারা প্যারাইটাল লোব এবং ল্যাটারাল সালকাস দ্বারা টেম্পোরাল লোব থেকে পৃথক থাকে।
- এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সামাজিক আচরণের কেন্দ্র।
- প্রাইমারি মোটর কর্টেক্স (Primary Motor Cortex): সেন্ট্রাল সালকাসের ঠিক আগের গাইরাসে অবস্থিত। এটি সমস্ত ঐচ্ছিক কঙ্কাল পেশির সঞ্চালন পরিচালনা করে। মস্তিষ্কের ডান মোটর কর্টেক্স দেহের বাম পাশের পেশি এবং বাম মোটর কর্টেক্স দেহের ডান পাশের পেশিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- ব্রোকার এলাকা (Broca's area): বাম ফ্রন্টাল লোবের নিচের অংশে অবস্থিত, যা বাকযন্ত্রের পেশি সমন্বয়ের মাধ্যমে কথা বলা ও সুস্পষ্ট উচ্চারণে প্রধান ভূমিকা রাখে।
২. প্যারাইটাল লোব (Parietal Lobe / পার্শ্বীয় ভাগ)
- সেন্ট্রাল সালকাসের পেছনে অবস্থিত।
- সোমাটোসেন্সরি কর্টেক্স (Primary Somatosensory Cortex): ত্বক ও বিভিন্ন অঙ্গ থেকে আগত স্পর্শ, চাপ, কম্পন, তাপমাত্রা এবং ব্যথার সংবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করে।[3]
৩. টেম্পোরাল লোব (Temporal Lobe / কর্ণ ভাগ)
- মস্তিষ্কের দুই পাশে কানের সন্নিকটে অবস্থিত।
- অডিটরি কর্টেক্স (Auditory Cortex): শব্দ শোনা এবং শ্রুত ভাষা ও বাক্যের অর্থ উপলব্ধির প্রধান কেন্দ্র (ওয়ার্নিকের এলাকা সংলগ্ন)।
- এর গভীরে থাকা হিপ্পোক্যাম্পাস দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি সংরক্ষণ এবং মানুষের চাক্ষুষ পরিচিতি (মুখমণ্ডল ও বস্তু শনাক্তকরণ)-তে সাহায্য করে।
৪. অক্সিপিটাল লোব (Occipital Lobe / পশ্চাৎ ভাগ)
- মস্তিষ্কের পেছনের অংশে অবস্থিত।
- ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স (Visual Cortex): চোখের রেটিনা থেকে অপটিক স্নায়ুর মাধ্যমে প্রেরিত দৃশ্যমান সংকেত বিশ্লেষণ করে ছবি বা দর্শনের অনুভূতি তৈরি করে।
মোটর পাথওয়ে ও আপার মোটর নিউরন
মোটর কর্টেক্সের পিরামিডাল কোষগুলোকে 'আপার মোটর নিউরন' (Upper Motor Neuron - UMN) বলা হয়। এদের দীর্ঘ অ্যাক্সন তন্তুগুলো ইন্টারনাল ক্যাপসুলের মধ্য দিয়ে ব্রেনস্টেমের মেডুলায় গিয়ে বিপরীত পাশে আড়াআড়িভাবে অতিক্রম (Decussation) করে। পরবর্তীতে এগুলো ব্রেনস্টেমের ক্র্যানিয়াল নার্ভ নিউক্লিয়াস এবং সুষুম্নাকাণ্ডের 'লোয়ার মোটর নিউরন' (Lower Motor Neuron - LMN)-এর সাথে সিন্যাপ্স গঠন করে কঙ্কাল পেশিতে উদ্দীপনা পৌঁছে দেয়।
রক্ত সংবহন ব্যবস্থা
গুরুমস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ প্রধানত দুটি ধমনি ব্যবস্থা দ্বারা সম্পন্ন হয়:
- ইন্টারনাল ক্যারোটিড ধমনি: অ্যান্টিরিওর ও মিডল সেরেব্রাল ধমনির মাধ্যমে ফ্রন্টাল, প্যারাইটাল ও টেম্পোরাল লোবের সিংহভাগে রক্ত যোগায়।
- ভার্টিব্রাল ধমনি: ব্যাসিলার ধমনি ও পোস্টেরিয়র সেরেব্রাল ধমনির মাধ্যমে অক্সিপিটাল লোব, ব্রেনস্টেম এবং লঘুমস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করে।
- করোটির তলদেশে এই ধমনিগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে প্রতিরক্ষামূলক উইলিসের বৃত্ত (Circle of Willis) তৈরি করে। ব্যবহৃত অশুদ্ধ রক্ত করোটীয় ভেনাস সাইনাসের মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়ে ইন্টারনাল জগুলার শিরার মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে ফিরে যায়।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ Standring, S. (2008). Gray's Anatomy: The Anatomical Basis of Clinical Practice (40th ed.). Elsevier, পৃ. x। ISBN 978-0-443-06684-9.
- ↑ Parts of the Brain – Boundless Psychology, ২০২৩।
- ↑ Hall, J. E., & Guyton, A. C. (2011). Guyton and Hall Physiology Review. Elsevier, পৃ. ১১৩–১৩৮। ISBN 978-1-4160-5452-8.
