করোটিক স্নায়ু / করোটীয় স্নায়ু (Cranial Nerves / করোটি স্নায়ু)

From LTRC
করোটিক স্নায়ু (Cranial nerves)
মস্তিষ্কের নিম্নভাগে করোটিক স্নায়ুসমূহ
শবব্যবচ্ছেদকৃত মানব মস্তিষ্কের তলদেশে দৃশ্যমান করোটিক স্নায়ুসমূহ
করোটিক স্নায়ুর বিন্যাস
মস্তিষ্ক ও ব্রেনস্টেম থেকে ক্রমানুসারে উৎপন্ন ১২ জোড়া করোটিক স্নায়ুর রূপরেখা
শারীরস্থানিক ও স্নায়বিক বিবরণ
ল্যাটিন নাম: nervi craniales
অংশ: প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (PNS)
মোট সংখ্যা: মানব ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী/পক্ষী/সরীসৃপে ১২ জোড়া (মৎস্য ও উভচরে ১০ জোড়া)
উৎপত্তিস্থল: গুরুমস্তিষ্ক (I-II) ও মস্তিষ্কের কাণ্ড বা ব্রেনস্টেম (III-XII)
প্রকৃতি: সংজ্ঞাবহ (Sensory), আজ্ঞাবহ (Motor) এবং মিশ্র (Mixed) স্নায়ু
প্রধান কাজ: দর্শন, ঘ্রাণ, শ্রবণ, স্বাদ, চোখের গতিবিধি, মুখমণ্ডলের অনুভূতি ও অভিব্যক্তি, এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গের প্যারাসিমপ্যাথেটিক নিয়ন্ত্রণ

করোটিক স্নায়ু বা করোটীয় স্নায়ু (Template:Lang-la, Template:Lang-en) হলো প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের অন্তর্গত বিশেষায়িত স্নায়ুর সমষ্টি, যা সুষুম্নাকাণ্ড থেকে উৎপন্ন না হয়ে সরাসরি মস্তিষ্ক ও ব্রেনস্টেমের বিভিন্ন নিউক্লিয়াস থেকে জোড়ায় জোড়ায় উৎপন্ন হয়ে করোটির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র (ফর্যামিনা) দিয়ে মুখমণ্ডল, ঘাড় ও বক্ষ-উদরীয় অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। মানবসহ সমস্ত এমনিওট (স্তন্যপায়ী, পাখি ও সরীসৃপ) প্রাণীদের দেহে মোট ১২ জোড়া করোটিক স্নায়ু থাকে, অন্যদিকে মাছ ও উভচর প্রাণীদের দেহে ১০ জোড়া করোটিক স্নায়ু বিদ্যমান।

রোমান সংখ্যা (I থেকে XII) অনুসারে এই স্নায়ুগুলোকে মস্তিষ্ক থেকে বের হওয়ার অগ্র-পশ্চাৎ ক্রমানুসারে চিহ্নিত করা হয়। এরা মূলত চোখ, নাক, কান ও জিহ্বার মতো সংবেদী অঙ্গের তথ্য মস্তিষ্কে বহন করে এবং মুখমণ্ডল ও গ্রীবার পেশিসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে। দশম করোটিক স্নায়ু বা ভেগাস স্নায়ু করোটি অতিক্রম করে হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ও পরিপাকনালীর স্বায়ত্তশাসিত কার্যকলাপে প্রধান প্যারাসিমপ্যাথেটিক নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে।[1]

১২ জোড়া করোটিক স্নায়ুর তালিকা ও কার্যাবলি

ক্রম নাম উৎপত্তি কেন্দ্র (নিউক্লিয়াস) প্রকৃতি প্রধান শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি
০ টার্মিনাল স্নায়ু (Cranial Nerve 0)[1] ঘ্রাণ ত্রিকোণ, ল্যামিনা টার্মিনালিস সংজ্ঞাবহ বিতর্কিত; গবেষণামতে ফেরোমোন ও প্রজনন সংবেদনশীলতা শনাক্তে সহায়ক।[2][3]
I ঘ্রাণ স্নায়ু (Olfactory) অ্যান্টিরিওর অলফ্যাক্টরি নিউক্লিয়াস (টেলেনসেফালন) সংজ্ঞাবহ নাসাগহ্বর থেকে মস্তিষ্কে গন্ধ বা ঘ্রাণের অনুভূতি বহন করে।
II দৃষ্টি স্নায়ু (Optic) ল্যাটারাল জেনিকুলেট নিউক্লিয়াস (ডায়েনসেফালন) সংজ্ঞাবহ চোখের রেটিনা থেকে মস্তিষ্কের কর্টেক্সে চাক্ষুষ বা দৃষ্টির তথ্য সংবহন।
III অকুলোমোটর স্নায়ু (Oculomotor) অকুলোমোটর ও এডিঙ্গার-ওয়েস্টফাল নিউক্লিয়াস (মেসেনসেফালন) মোটর চোখের অধিকাংশ বহিঃস্থ পেশি (সুপিরিয়র, মিডিয়াল, ইনফিরিয়র রেকটাস ও ইনফিরিয়র অবলিক) সঞ্চালন ও পিউপিল সংকোচন।
IV ট্রকলিয়ার স্নায়ু (Trochlear) ট্রকলিয়ার নিউক্লিয়াস (মধ্যমস্তিষ্ক) মোটর চোখের সুপিরিয়র অবলিক পেশি নিয়ন্ত্রণ (চোখের মণি নিচে ও বাইরের দিকে ঘোরানো)।
V ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু (Trigeminal) প্রধান সংজ্ঞাবহ, স্পাইনাল, মেসেনসেফালিক ও মোটর নিউক্লিয়াস (পনস) মিশ্র মুখমণ্ডলের স্পর্শ, তাপমাত্রা ও ব্যথা সংবেদন গ্রহণ এবং চর্বণ পেশিসমূহ নিয়ন্ত্রণ।
VI অ্যাবডুসেন্স স্নায়ু (Abducens) অ্যাবডুসেন্স নিউক্লিয়াস (পনস) মোটর চোখের ল্যাটারাল রেকটাস পেশি সংকোচন (চোখের মণি বাইরের দিকে নেওয়া বা Abduction)।
VII ফেসিয়াল স্নায়ু (Facial) ফেসিয়াল মোটর, সলিটারি ও সুপিরিয়র স্যালিভাটরি নিউক্লিয়াস মিশ্র মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি পেশি, জিহ্বার অগ্রভাগের ২/৩ অংশের স্বাদ গ্রহণ, অশ্রু ও লালাগ্রন্থির ক্ষরণ।
VIII ভেস্টিবুলোককলিয়ার স্নায়ু (Vestibulocochlear) ভেস্টিবুলার ও ককলিয়ার নিউক্লিয়াস (পনস-মেডুলা সংযোগ) সংজ্ঞাবহ কর্ণের ককলিয়া থেকে শব্দ সংবেদন (শ্রবণ) এবং ভেস্টিবুলার সিস্টেম থেকে দেহের ভারসাম্য রক্ষা।
IX গ্লসোফ্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ু (Glossopharyngeal) নিউক্লিয়াস অ্যাম্বিগুয়াস, ইনফিরিয়র স্যালিভাটরি ও সলিটারি নিউক্লিয়াস মিশ্র জিহ্বার পশ্চাৎ ১/৩ অংশের স্বাদ ও স্পর্শ, প্যারোটিড লালাগ্রন্থির ক্ষরণ ও গলবিলের পেশি সঞ্চালন।
X ভেগাস স্নায়ু (Vagus) নিউক্লিয়াস অ্যাম্বিগুয়াস, ডরসাল মোটর ও সলিটারি নিউক্লিয়াস (মেডুলা) মিশ্র স্বরযন্ত্র ও গলবিলের পেশি নিয়ন্ত্রণ, হৃদস্পন্দন হ্রাস, ফুসফুস ও পরিপাকনালীর প্যারাসিমপ্যাথেটিক ক্রিয়া।
XI এক্সেসরি স্নায়ু (Accessory) নিউক্লিয়াস অ্যাম্বিগুয়াস ও স্পাইনাল এক্সেসরি নিউক্লিয়াস মোটর গ্রীবার স্টার্নোক্লিডোমাস্টয়েড এবং ট্র্যাপিজিয়াস পেশি নিয়ন্ত্রণ (ঘাড় ঘোরানো ও কাঁধ তোলা)।
XII হাইপোগ্লোসাল স্নায়ু (Hypoglossal) হাইপোগ্লোসাল নিউক্লিয়াস (মেডুলা অবলংগাটা) মোটর জিহ্বার সমস্ত অভ্যন্তরীণ ও বেশিরভাগ বহিঃস্থ পেশির চলন (খাদ্য চর্বণ, গিলন ও বাক-উচ্চারণ)।

চিকিৎসাগত তাৎপর্য (Clinical Significance)

করোটিক স্নায়ু পরীক্ষা (Cranial Nerve Examination) স্নায়ুরোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মৌলিক পদ্ধতি:

  • অ্যানোসমিয়া (Anosmia): অলফ্যাক্টরি স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঘ্রাণশক্তি লোপ পাওয়া।
  • চক্ষুপেশির পক্ষাঘাত: ৩য়, ৪র্থ বা ৬ষ্ঠ স্নায়ুর ক্ষতিতে চোখ ট্যারা হওয়া (Strabismus) এবং দ্বৈত দৃষ্টি (Diplopia) সৃষ্টি।
  • ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া: ৫ম স্নায়ুর প্রদাহে মুখে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো তীব্র যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা।
  • বেলস পলসি (Bell's Palsy): ৭ম স্নায়ু অবশ হয়ে মুখমণ্ডলের একপাশ ঝুলে যাওয়া।
  • ভেগাস ডিসফাংশন: ১০ম স্নায়ুর ত্রুটিতে কণ্ঠস্বর কর্কশ হওয়া (Hoarseness) এবং খাবার গিলতে সমস্যা (Dysphagia)।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. ↑ 1.0 1.1 Fuller, G. N., & Burger, P. C. (1990). Nervus terminalis (cranial nerve zero) in the adult human. Clin Neuropathol, 9(6), 279-283.
  2. ↑ Merideth, M. (2001). Human Vomeronasal Organ Function. Chemical Senses.
  3. ↑ Fields, R. D. (2007). Sex and the Secret Nerve. Scientific American Mind.