এরগোনোভিন

From LTRC

Template:তথ্যছক ঔষুধ

এরগোনোভিন (Template:Lang-en), যা আন্তর্জাতিকভাবে এরগোমেট্রিন (Ergometrine) নামেও পরিচিত, হলো একটি প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত জল-দ্রবণীয় ইনডোল অ্যালকালয়েড। এটি মূলত রাই (Rye) ও অন্যান্য খাদ্যশস্যে আক্রমণকারী পরজীবী ছত্রাক ক্ল্যাভিসেপস পারপিউরিয়া (Claviceps purpurea) দ্বারা উৎপন্ন স্ক্লেরোটিয়া বা এরগট (Ergot) থেকে নিষ্কাশন করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এরগোমেট্রিন ম্যালেয়েট লবণ হিসেবে প্রসবোত্তর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (Postpartum hemorrhage) প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য অক্সিটোসিক ওষুধ হিসেবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

ছত্রাকীয় উৎস ও জীবতত্ত্ব

এরগোনোভিনের প্রধান প্রাকৃতিক উৎস হলো অ্যাসকোমাইকোটা পর্বের ছত্রাক ক্ল্যাভিসেপস পারপিউরিয়া।

  • সংক্রমণ ও স্ক্লেরোটিয়া গঠন: এই ছত্রাকটি ঘাস ও দানাদার শস্যের (বিশেষ করে রাই) পুষ্পমঞ্জরিতে আক্রমণ করে। আক্রান্ত শস্যে দানার পরিবর্তে ছত্রাকজালের (mycelium) শক্ত ও ঘন পুঞ্জ তৈরি হয়, যাকে স্ক্লেরোটিয়া (Sclerotia) বা এরগট বডি বলা হয়।
  • এরগটিজম: মধ্যযুগে এই ছত্রাক সংক্রামিত আটা বা রুটি খাওয়ার ফলে মানুষ ও গবাদিপশুতে "সেন্ট অ্যান্টনিস ফায়ার" বা মারাত্মক এরগটিজম (Ergotism) বিষক্রিয়া দেখা দিত, যার ফলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পচন (gangrene) ও খিঁচুনি হতো।
  • পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে এই ছত্রাকীয় বিষাক্ত উপাদানের মধ্য থেকেই মানবকল্যাণে ব্যবহারযোগ্য নির্দিষ্ট সক্রিয় অ্যালকালয়েড পৃথক করতে সক্ষম হন।

আবিষ্কারের ইতিহাস

১৫৮২ সালে জার্মান চিকিৎসক অ্যাডাম লোনিসার প্রথম উল্লেখ করেন যে ধাত্রীরা প্রসব ত্বরান্বিত করতে এরগট ছত্রাকের ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করতেন। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন চ্যাসার ময়ার (John Chassar Moir) এবং হ্যারল্ড ওয়ার্ড ডাডলি এরগট ছত্রাক থেকে পানিতে দ্রবণীয় সক্রিয় উপাদান হিসেবে এরগোমেট্রিন পৃথক করেন।[1] প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এটি আধুনিক প্রসূতিবিদ্যায় লক্ষ লক্ষ প্রসূতি মায়ের জীবন রক্ষা করেছে।

রাসায়নিক ধর্ম ও নিষ্কাশন

  • গাঠনিক প্রকৃতি: এরগোনোভিন হলো লাইসার্জিক অ্যাসিডের একটি ডেরিভেটিভ (অ্যামাইড), যার মূল কাঠামোতে একটি টেট্রাসাইক্লিক এরগোলিন (ergoline) রিং বিদ্যমান।
  • ভৌত বৈশিষ্ট্য: এটি একটি সাদা বা হালকা হলুদ বর্ণের গন্ধহীন মাইক্রোক্রিস্টালাইন গুঁড়া। বাতাসের সংস্পর্শে ও অতিরিক্ত আলোতে এটি দ্রুত বিবর্ণ ও কালচে হয়ে যায়।
  • নিষ্কাশন প্রক্রিয়া: বাণিজ্যিকভাবে C. purpurea-এর কালচার বা নিয়ন্ত্রিত ফার্মেন্টেশন ব্রথ থেকে টলুইন/ইথানল দ্রাবকের সাহায্যে নিষ্কাশন ও লিকুইড-লিকুইড এক্সট্রাকশন এবং স্ফটিকীকরণ (crystallization) প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ এরগোনোভিন প্রস্তুত করা হয়।[2]

চিকিৎসায় প্রয়োগ ও কার্যপদ্ধতি

  • অক্সিটোসিক প্রভাব: এরগোনোভিন জরায়ুর মসৃণ পেশির আলফা-অ্যাড্রেনার্জিক এবং সেরোটোনিন রিসেপ্টরকে উদ্দীপিত করে। ফলে জরায়ুর পেশিতে তীব্র সংকোচন সৃষ্টি হয় এবং প্রসব পরবর্তী উন্মুক্ত রক্তনালীগুলো চেপে গিয়ে দ্রুত রক্তপাত বন্ধ হয়।
  • করোনারি ধমনী পরীক্ষা: হৃদরোগ বিদ্যায় প্রিন্টজমেটাল অ্যানজাইনা (স্প্যাজমজনিত হৃদব্যথা) নির্ণয়ে বিশেষ ডায়াগনস্টিক এজেন্ট হিসেবেও এটি নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ব্যবহৃত হয়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ বা সংবেদনশীল রোগীদের ক্ষেত্রে এরগোনোভিন কিছু প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে:

  • রক্তনালী সংকোচনের কারণে রক্তচাপ হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়া (উচ্চ রক্তচাপ)।
  • বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা ও বুক ধড়ফড় করা।
  • শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা এবং সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া।
  • উচ্চ রক্তচাপ বা প্রিক্ল্যাম্পসিয়ায় আক্রান্ত প্রসূতিদের ক্ষেত্রে এটি সতর্কতার সাথে প্রয়োগ করতে হয়।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

শ্রেণী:ছত্রাক শ্রেণী:অ্যালকালয়েড শ্রেণী:ঔষধ শ্রেণী:প্রসূতিবিজ্ঞান শ্রেণী:জৈব যৌগ