এফিড্রিন (Ephedrine)

From LTRC

Template:Drugbox

এফিড্রিন (ইংরেজি: Ephedrine) হলো একটি চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ, যা প্রধানত নিম্ন রক্তচাপ (Hypotension) নিয়ন্ত্রণ এবং এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এটি সিমপ্যাথোমিমেটিক (Sympathomimetic) শ্রেণীর ওষুধের অন্তর্ভুক্ত। অ্যানেস্থেসিয়া বা অবশ করার সময় রক্তচাপ কমে গেলে তা স্বাভাবিক করতে এফডিএ (FDA)-অনুমোদিত একটি প্রাথমিক ওষুধ হিসেবে এফিড্রিন ব্যবহৃত হয়।[1]

এছাড়াও এফিড্রিন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এটি শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি (ব্রঙ্কোডাইলেটর হিসেবে), নাক বন্ধ হওয়া (ডিকনজেস্ট্যান্ট হিসেবে), অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন এবং মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিস (Myasthenia gravis)-এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি, নারকোলেপসি (অতিরিক্ত ঘুম), ঋতুস্রাবজনিত সমস্যা (ডিসমেনোরিয়া) এবং মূত্র নিয়ন্ত্রণের সমস্যার চিকিৎসায়ও এফিড্রিনের ব্যবহার রয়েছে।[2]

এফিড্রিন মূলত এফিড্রা (Ephedra) নামক উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত একটি অ্যালকালয়েড (Alkaloid)। এটি অ্যাড্রেনার্জিক রিসেপ্টরগুলোকে সরাসরি উদ্দীপিত করে রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে এবং ব্রঙ্কিয়াল পেশীগুলোকে শিথিল করে। চীনে হাঁপানি এবং অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের চিকিৎসায় প্রায় ৫,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।[3]

ইতিহাস

এফিড্রা হলো একটি চীনা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, যা হাজার হাজার বছর ধরে চীনে ঔষধি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৮৮৫ সালে জাপানি রসায়নবিদ নাগাই (Nagai) সর্বপ্রথম বিশুদ্ধ অ্যালকালয়েড হিসেবে এফিড্রিনকে আলাদা এবং শ্রেণিবদ্ধ করেন। তবে ১৯২০-এর দশকের শুরুতে চেন (Chen) এবং শ্মিডট (Schmidt)-এর দ্বারা এটি পুনরায় আবিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত এর ব্যবহার অনেকটাই আড়ালে ছিল।[4] ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে হাঁপানির চিকিৎসায় এফিড্রিন জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায়, কারণ অ্যাডেনালিনের মতো ইনজেকশনের পরিবর্তে এটি মুখে খাওয়া যেত। তবে এর পর থেকে চিকিৎসায় এর ব্যবহার ধীরে ধীরে কমতে থাকে।[4]

এফিড্রা উদ্ভিদের বর্ণনা

এফিড্রা (Ephedra) হলো পাকিস্তান, চীন এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি স্থানীয় গুল্ম। কিছু প্রজাতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতেও জন্মায়। এটি একটি চিরহরিৎ উদ্ভিদ, যার গড় উচ্চতা ১ ফুট হলেও এটি ৪ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে। আগস্ট মাসে এই গাছে রসালো, লাল রঙের শঙ্কু আকৃতির ফল ধরে যা দেখতে অনেকটা বেরির মতো, তবে এগুলো বিষাক্ত। এফিড্রার তিনটি প্রধান প্রজাতি হলো Ephedra sinica, Ephedra equisetina এবং Ephedra intermedia, যেগুলোকে একত্রে চীনা ভাষায় 'মা-হুয়াং' (Ma-huang) বলা হয়।[5]

উৎপাদন পদ্ধতি

বাণিজ্যিকভাবে এফিড্রিন তিনটি পদ্ধতিতে উৎপাদন করা হয়: ১. এফিড্রা উদ্ভিদ থেকে সরাসরি নিষ্কাশনের মাধ্যমে। ২. সম্পূর্ণ রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে। ৩. চিনির গাজন (Fermentation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আধা-সংশ্লেষিত (Semi-synthetic) পদ্ধতিতে।[6]

ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম

এফিড্রিন হলো ফিনাইলপ্রোপেন (Phenylpropane) শ্রেণীর একটি জৈব যৌগ। এটি সাধারণত হাইড্রোক্রোরাইড বা সালফেট লবণ হিসেবে বিক্রি হয় এবং দেখতে সাদা বা বর্ণহীন স্ফটিকের মতো।[7]

বৈশিষ্ট্য মান
আণবিক সংকেত C10H15NO
আণবিক ভর ১৬৫.২৩ গ্রাম/মোল
গলনাঙ্ক ৩৪ °C
স্ফুটনাঙ্ক ২৫৫ °C (বিয়োজিত হয়)
দ্রাব্যতা পানি, ইথানল, বেনজিন এবং ক্লোরোফর্মে দ্রবণীয়।
ঘনত্ব ১.০০৮৫ গ্রাম/সেমি³ (২২ °C তাপমাত্রায়)

চিকিৎসায় ব্যবহার

  • অ্যানেস্থেসিয়ার সময় রক্তচাপ অস্বাভাবিক কমে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে এটি ব্যবহৃত হয়।
  • এটি ব্রঙ্কোস্পাজম বা হাঁপানির মতো অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ায় শ্বাসনালী প্রশস্ত করতে সহায়ক।
  • নারকোলেপসি এবং মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিস-এর চিকিৎসায় এর ব্যবহার রয়েছে।
  • স্টোকস-অ্যাডামস (Stokes-Adams) সিনড্রোমের মতো হৃদস্পন্দনের সমস্যায় এটি ব্যবহৃত হতে পারে।[8]

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

  • হাইপারথাইরয়েডিজম, ডায়াবেটিস, গ্লুকোমা এবং কিডনির সমস্যা থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এফিড্রিন খুব সাবধানে ব্যবহার করা উচিত।
  • থিওফাইলিনের সাথে এফিড্রিন ব্যবহার করলে বমি বমি ভাব, স্নায়বিক উত্তেজনা এবং অনিদ্রা দেখা দিতে পারে।[9]
  • উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড, অক্সিটোসিন এবং কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের সাথে এফিড্রিন ব্যবহার করলে বিভিন্ন জটিলতা (যেমন- অ্যারিথমিয়া বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন) তৈরি হতে পারে।
  • এই ওষুধ সেবনের পর মাথা ঘোরা বা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব হতে পারে। তাই এটি সেবন করার পর গাড়ি চালানো বা ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনা করা থেকে বিরত থাকা উচিত।[10]

তথ্যসূত্র

Template:সূত্র তালিকা

বিষয়শ্রেণী:SciWiki Medicines বিষয়শ্রেণী:ওষুধ বিষয়শ্রেণী:রাসায়নিক যৌগ বিষয়শ্রেণী:অ্যালকালয়েড