অ্যানজাইনা / বক্ষশূল (Angina / Angina Pectoris)

From LTRC
অ্যানজাইনা (Angina)
অ্যানজাইনা পেক্টোরিসের ব্যথার বিস্তৃতি
করোনারি ধমনি ব্যাধিজনিত অস্বস্তির রেখাচিত্র: বুকের মাঝে চাপ, ভারী ভাব বা ব্যথা যা ঘাড়, চোয়াল, কাঁধ, পিঠ বা বাহুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে
চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় বিবরণ
চিকিৎসা ক্ষেত্র: হৃদরোগবিজ্ঞান (Cardiology), জরুরি চিকিৎসাবিজ্ঞান
অন্য নাম: অ্যানজাইনা পেক্টোরিস (Angina pectoris), বক্ষশূল
প্রধান প্রকারভেদ: স্টেবল অ্যানজাইনা (সুস্থিত), আনস্টেবল অ্যানজাইনা (অস্থির), ভ্যারিয়েন্ট বা প্রিনজমেটাল অ্যানজাইনা
প্রধান লক্ষণসমূহ: বুকে নিষ্পেষণমূলক ব্যথা বা চাপ, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব, ব্যথা বাম বাহু বা চোয়ালে বিকিরণ
প্রধান কারণ: মায়োকার্ডিয়াল ইসকেমিয়া (করোনারি ধমনির সংকীর্ণতা বা ভাসোস্পাজম)
ঝুঁকির কারণ: হাইপারলিপিডেমিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
পার্থক্যমূলক রোগ নির্ণয়: অ্যাওর্টিক ডিসেকশন, পালমোনারি এমবোলিজম, পেরিকার্ডাইটিস, জিইআরডি (GERD), নিউমোথোরাক্স
চিকিৎসা: জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নাইট্রেট (নাইট্রোগ্লিসারিন), বিটা-ব্লকার, ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার, স্ট্যাটিন, এনজিওপ্লাস্টি (PCI), বাইপাস (CABG)

অ্যানজাইনা (Template:Lang-en), যা পূর্ণ চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় নামে অ্যানজাইনা পেক্টোরিস (Template:Lang-la, বাংলায় বক্ষশূল) নামে পরিচিত, হলো হৃদযন্ত্রের পেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেনযুক্ত রক্তের প্রবাহ বা সরবরাহে ঘাটতিজনিত কারণে (মায়োকার্ডিয়াল ইসকেমিয়া) সৃষ্ট বুকে অস্বস্তি, চাপ, ভারী ভাব বা তীব্র ব্যথার একটি উপসর্গ।[1] এই ব্যথা কেবল বুকেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা প্রায়শই ঘাড়, নিচের চোয়াল, কাঁধ, পিঠের মধ্যভাগ কিংবা বাম বাহুতে ছড়িয়ে পড়ে (Radiation of pain)। ব্যথার পাশাপাশি রোগীর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম এবং বমি বমি ভাবের অনুভূতি হতে পারে।[2]

'অ্যানজাইনা' শব্দটি লাতিন শব্দ angere (যার অর্থ শ্বাসরোধ করা বা চেপে ধরা) এবং pectus (যার অর্থ বক্ষ বা বুক) থেকে উদ্ভূত হয়েছে; যার আক্ষরিক অর্থ "বুকে শ্বাসরোধকারী অনুভূতি"।[3] এটি স্বয়ং কোনো একক রোগ নয়, বরং অন্তর্নিহিত করোনারি ধমনি ব্যাধির (CAD) একটি প্রধান সতর্কতামূলক লক্ষণ।

প্রধান প্রকারভেদ

ক্লিনিকাল বৈশিষ্ট্য ও ব্যথার প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে অ্যানজাইনাকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়:

  • স্টেবল অ্যানজাইনা (Stable Angina / সুস্থিত বক্ষশূল): সর্বাধিক সাধারণ রূপ। এটি সাধারণত শারীরিক পরিশ্রম (যেমন দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সিঁড়ি ভাঙা), মানসিক চাপ বা ভারী খাবার গ্রহণের পর ঘটে, যখন হৃদপেশির অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায়। বিশ্রাম নিলে বা জিহ্বার নিচে নাইট্রোগ্লিসারিন ট্যাবলেট/স্প্রে প্রয়োগ করলে সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে ব্যথা উপশম হয়।[2]
  • আনস্টেবল অ্যানজাইনা (Unstable Angina / অস্থায়ী বা অস্থির বক্ষশূল): এটি একটি তীব্র ও বিপজ্জনক রূপ। কোনো শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই সম্পূর্ণ বিশ্রামরত অবস্থায় এটি আকস্মিকভাবে শুরু হয় এবং সহজে উপশম হয় না। এটি করোনারি ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধার প্রাথমিক সংকেত এবং আসন্ন হার্ট অ্যাটাকের পূর্ববর্তী তীব্র জরুরি অবস্থা নির্দেশ করে।[4]
  • প্রিনজমেটাল বা ভ্যারিয়েন্ট অ্যানজাইনা (Prinzmetal's Angina): করোনারি ধমনির আকস্মিক ক্ষণস্থায়ী তীব্র সংকোচন বা ভাসোস্পাজম (Vasospasm)-এর ফলে এটি ঘটে। এটি সাধারণত গভীর রাতে বা ভোরে বিশ্রামরত অবস্থায় দেখা দেয়।
  • মাইক্রোভাসকুলার অ্যানজাইনা (Microvascular Angina): প্রধান করোনারি ধমনিগুলোতে ব্লকেজ না থাকলেও হৃদপেশির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোর (Microvessels) কার্যকারিতা নষ্ট হলে এই ব্যথা হয়।

কারণ ও ঝুঁকির নিয়ামকসমূহ

হৃদপেশিতে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনির রক্তপ্রবাহে বাধা বা ঘাটতি অ্যানজাইনার মূল কারণ:[1]

  • অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis): রক্তনালীর অভ্যন্তরীণ দেয়ালে কোলেস্টেরল, লিপিড ও ক্যালসিয়াম জমে প্লাক তৈরি হওয়া এবং রক্ত চলাচলের পথ সরু হয়ে যাওয়া।
  • প্রধান ঝুঁকির নিয়ামক:
    • রক্তে উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড (Hyperlipidemia)।
    • দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension)।
    • ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার।
    • অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস মেলিটাস।
    • স্থূলতা (Obesity) ও কায়িক শ্রমহীন অলস জীবনযাপন।
    • রক্তস্বল্পতা (Anemia - যা রক্তে অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমায়), অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (অ্যারিথমিয়া) এবং হার্ট ফেইলিউর।[4]

পার্থক্যমূলক রোগ নির্ণয় (Differential Diagnosis)

বুকের ব্যথার অন্যান্য সম্ভাব্য অ-করোনারি কারণগুলো আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি:

  • মহাধমনি ছিঁড়ে যাওয়া (Aortic dissection) ও পালমোনারি এমবোলিজম।
  • হৃদপর্দার প্রদাহ (Pericarditis)।
  • গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD / তীব্র গ্যাস্ট্রিক বা বুকজ্বালা)।
  • নিউমোথোরাক্স ও বুকের পেশির প্রদাহ (Costochondritis)।
  • প্যানিক অ্যাটাক বা তীব্র মানসিক উদ্বেগ (Anxiety)।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যথার তীব্রতা কমানো, হৃদপেশির রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রতিরোধ করা:[5]

১. তাত্ক্ষণিক ও প্রতিরোধমূলক ঔষধভিত্তিক চিকিৎসা

  • নাইট্রেট (Nitrates): তীব্র ব্যথার সময় সাবলিঙ্গুয়াল নাইট্রোগ্লিসারিন দ্রুত করোনারি রক্তনালী প্রসারিত করে হৃদপেশিতে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি করে।
  • বিটা-ব্লকার (Beta-blockers): হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ কমিয়ে হৃদযন্ত্রের কাজের চাপ ও অক্সিজেনের চাহিদা হ্রাস করে (যেমন মেটোপ্রোলল, অ্যাটেনোলল)।
  • ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার (CCBs): রক্তনালী শিথিল ও প্রসারিত করতে ব্যবহৃত হয় (যেমন অ্যামলোডিপিন, ডিলটিয়াজেম)।
  • অ্যান্টিপ্লাটিলেট ওষুধ: রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধে প্রতিদিন স্বল্পমাত্রার অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেল।
  • স্ট্যাটিন (Statins): রক্তের কোলেস্টেরল কমিয়ে প্লাক স্থিতিশীল রাখতে অ্যাটরভাস্ট্যাটিন বা রোসুভাস্ট্যাটিন।
  • এসিই ইনহিবিটর (ACE Inhibitors): রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও হৃদপেশির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।

২. রিভাস্কুলারাইজেশন ও শল্যচিকিৎসা

ওষুধে লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে না এলে কিংবা ধমনিতে গুরুতর ব্লকেজ থাকলে ইন্টারভেনশনাল পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়:

  • পারকিউটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন (PCI / এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্টিং): সরু হয়ে যাওয়া ধমনি বেলুন দিয়ে প্রসারিত করে সেখানে একটি ধাতব বা ওষুধযুক্ত স্টেন্ট (Stent) বসানো।
  • করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফটিং (CABG): একাধিক ধমনীতে জটিল ব্লকেজ থাকলে শরীরের অন্য স্থান থেকে রক্তনালী এনে বাইপাস সার্জারি করা।

৩. জীবনযাত্রার পরিবর্তন

  • ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করা।
  • খাদ্যতালিকায় লবণ, চিনি ও অতিরিক্ত প্রাণিজ চর্বি পরিহার করে শাকসবজি ও ফলমূল বৃদ্ধি করা।
  • নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম করা এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকা।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. ↑ 1.0 1.1 Hermiz, C., & Sedhai, Y. R. (2020). Angina. StatPearls. PMID 32491604.
  2. ↑ 2.0 2.1 Angina – National Health Service (NHS), ২০১৭।
  3. ↑ Padsalgikar, A. (2017). Plastics in Medical Devices for Cardiovascular Applications. Elsevier Science, পৃ. ১২৬। ISBN 978-0-323-37122-3.
  4. ↑ 4.0 4.1 Goyal, A., & Zeltser, R. (2020). Unstable Angina. StatPearls. PMID 28723029.
  5. ↑ Angina - Treatment – NHS, ২০১৭।