অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন / অলিন্দ কম্পন (Atrial Fibrillation / AFib)
| অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (AFib) | |
|---|---|
ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG)-এ অনিয়মিত ও অসম ব্যবধানযুক্ত হৃদস্পন্দন (AFib) | |
| চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় বিবরণ | |
| চিকিৎসা ক্ষেত্র: | হৃদরোগবিজ্ঞান (Cardiology), ইলেকট্রোফিজিওলজি |
| অন্য নাম: | অলিন্দ কম্পন, এ-ফিব (AF / AFib) |
| ধরণ: | সুপ্রাভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া, কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া |
| লক্ষণসমূহ: | বুক ধড়ফড়ানি (Palpitations), শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি ও দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বুকে চাপ বা ব্যথা |
| প্রধান জটিলতা: | ইসকেমিক স্ট্রোক, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া (Heart failure), ডিমেনশিয়া |
| ঝুঁকির কারণ: | উচ্চ রক্তচাপ, ভালভুলার হৃদরোগ, করোনারি ধমনি ব্যাধি, সিওপিডি, স্থূলতা, অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া, থাইরোটক্সিকোসিস, অ্যালকোহল সেবন |
| রোগ নির্ণয়: | নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা, ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG), হোল্টার মনিটরিং, ইকোকার্ডিওগ্রাফি |
| চিকিৎসা: | অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট থেরাপি, রেট/রিদম কন্ট্রোল ওষুধ, ইলেকট্রিক্যাল কার্ডিওভার্সন, ক্যাথেটার অ্যাবলেশন |
অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (Template:Lang-en, সংক্ষেপে AF বা AFib) হলো হৃদস্পন্দনের সর্বাধিক প্রচলিত ও গুরুতর এক প্রকার ছন্দপতন বা কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া (Arrhythmia), যাতে হৃৎপিণ্ডের ওপরের দুটি প্রকোষ্ঠ অর্থাৎ অলিন্দদ্বয় (Atria) অত্যন্ত দ্রুত, বিশৃঙ্খল ও অনিয়মিতভাবে সংকুচিত ও স্পন্দিত হয়।[1] স্বাভাবিক অবস্থায় সাইনাস নোড থেকে সুশৃঙ্খল বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়ে হৃৎস্পন্দন পরিচালিত হলেও, অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনে অলিন্দে প্রতি মিনিটে ৩০০ থেকে ৬০০টি বিশৃঙ্খল বৈদ্যুতিক তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। এর ফলে অলিন্দ রক্তকে কার্যকরভাবে নিলয়ে পাম্প করতে ব্যর্থ হয় এবং নিলয়ও অনিয়মিত ও দ্রুত গতিতে (সাধারণত মিনিটে ১০০–১৭৫ বার) স্পন্দিত হতে থাকে।[2]
অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের প্রধান বিপদ হলো অলিন্দের রক্তপ্রবাহে স্থবিরতা তৈরি হওয়া, যার ফলে অলিন্দে রক্তের জমাট বাঁধার (Thrombus) ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই রক্তের ক্লট পরবর্তীতে রক্তস্রোতের মাধ্যমে মস্তিষ্কে গিয়ে রক্তনালী বন্ধ করে প্রাণঘাতী স্ট্রোক (Stroke) বা অঙ্গে গ্যাংগ্রিন সৃষ্টি করতে পারে।
প্রধান প্রকারভেদ
চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগের স্থায়িত্ব ও প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে একে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়:
- প্যারোক্সিসমাল (Paroxysmal AF): অনিয়মিত স্পন্দন হঠাৎ শুরু হয় এবং সাধারণত ৭ দিনের মধ্যে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২৪–৪৮ ঘণ্টায়) আপনা-আপনি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে।
- পারসিস্টেন্ট (Persistent AF): অনিয়মিত স্পন্দন ক্রমাগত ৭ দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং স্বাভাবিক ছন্দে ফেরাতে ওষুধ বা ইলেকট্রিক্যাল শক (কার্ডিওভার্সন)-এর প্রয়োজন হয়।
- লং-স্ট্যান্ডিং পারসিস্টেন্ট (Long-standing Persistent AF): অবিচ্ছিন্নভাবে এক বছরের বেশি সময় ধরে বিদ্যমান থাকে।
- পার্মানেন্ট (Permanent AF): যখন স্বাভাবিক সাইনাস রিদম পুনরুদ্ধার করা আর সম্ভব হয় না এবং চিকিৎসক ও রোগী অনিয়মিত ছন্দ মেনে নিয়ে কেবল হার্ট রেট নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেন।
ক্লিনিকাল লক্ষণ ও উপসর্গ
অনেক ক্ষেত্রে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন সম্পূর্ণ উপসর্গহীন (Asymptomatic) থাকে এবং সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বা অন্য রোগের তদন্তকালে আকস্মিকভাবে শনাক্ত হয়।[3] লক্ষণ প্রকাশ পেলে নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো দেখা যায়:
- বুক ধড়ফড়ানি (Palpitations): বুকে দ্রুত, লাফালাফি বা অনিয়মিত স্পন্দন অনুভূত হওয়া।
- ক্লান্তি ও দুর্বলতা: হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামান্য পরিশ্রমে অতিরিক্ত ক্লান্তি।
- শ্বাসকষ্ট (Dyspnea): শারীরিক পরিশ্রমে বা শোয়া অবস্থায় শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
- মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা এবং সাময়িক অচেতনতা (Syncope)।
- বুকে অস্বস্তি, চাপ বা মৃদু ব্যথা (অ্যাঞ্জাইনা)।
কারণ ও ঝুঁকির নিয়ামকসমূহ
হৃৎপিণ্ডের গঠনগত পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা চাপ অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের মূল কারণ:[4]
- কার্ডিওভাসকুলার রোগ: দীর্ঘমেয়াদী অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension), করোনারি ধমনি ব্যাধি (CAD), ভালভুলার হৃদরোগ (বিশেষ করে রিউম্যাটিক মাইট্রাল ভালভ স্টেনোসিস), কার্ডিওমায়োপ্যাথি এবং জন্মগত হৃদত্রুটি।
- ফুসফুসের রোগ: ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD), পালমোনারি এমবোলিজম এবং অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (OSA)।
- বিপাকীয় ও হরমোনীয় ব্যাধি: অতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড গ্রন্থি বা থাইরোটক্সিকোসিস (Hyperthyroidism), স্থূলতা (Obesity) এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস।
- জীবনযাত্রাজনিত কারণ: অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান (Holiday Heart Syndrome), ধূমপান, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ।
রোগ নির্ণয় পদ্ধতি
১. শারীরিক ও নাড়ির পরীক্ষা: হাতের কবজিতে রেডিয়ালে নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা করলে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল ও অনিয়মিত ছন্দ (Irregularly irregular pulse) ধরা পড়ে। ২. ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG): রোগ শনাক্তকরণের স্বর্ণমান পরীক্ষা। ইসিজিতে কোনো স্বাভাবিক 'P-ওয়েভ' থাকে না; এর পরিবর্তে সূক্ষ্ম দ্রুত ফিব্রিলেটরি তরঙ্গ (f-waves) এবং অনিয়মিত 'R-R ইন্টারভ্যাল' দৃশ্যমান হয়।[5] ৩. হোল্টার মনিটরিং (Holter Monitor): ক্ষণস্থায়ী বা প্যারোক্সিসমাল এ-ফিব শনাক্ত করতে রোগীর শরীরে ২৪ ঘণ্টা থেকে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত বহনযোগ্য ইসিজি ডিভাইস যুক্ত রাখা হয়। ৪. ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Echocardiogram): ট্রান্সথোরাসিক (TTE) বা ট্রান্সইসোফেজিয়াল (TEE) ইকোর মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের ভালভের অবস্থা, অলিন্দের আকার এবং বিশেষ করে বাম অলিন্দে রক্তের ক্লট আছে কি না তা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য তিনটি: স্ট্রোক প্রতিরোধ, অতিরিক্ত হার্ট রেট নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভব হলে স্বাভাবিক ছন্দ পুনরুদ্ধার।[6]
১. স্ট্রোক প্রতিরোধ ও অ্যান্টিকোয়াগুলেশন (Anticoagulation)
রোগীর স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য $\text{CHA}_2\text{DS}_2\text{-VASc}$ স্কোর ব্যবহার করা হয়। মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে রক্ত পাতলাকারী ওষুধ অপরিহার্য:[7]
- নভেল ওরাল অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্টস (NOACs / DOACs): আধুনিক চিকিৎসায় ওয়ারফারিনের চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় (যেমন: অ্যাপিজাবান, রিভারোক্সাবান, ডাবিগাট্রান)। এগুলো ব্যবহারের সুবিধা হলো ঘন ঘন রক্ত পরীক্ষার (INR) প্রয়োজন হয় না।[8]
- ভিটামিন কে বিরোধী: ওয়ারফারিন (Warfarin) বিশেষ করে মেকানিক্যাল কৃত্রিম ভালভযুক্ত রোগীদের জন্য এখনও কার্যকর।
২. হার্ট রেট নিয়ন্ত্রণ (Rate Control)
নিলয়ের দ্রুত স্পন্দন কমিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় (বিশ্রামে < ৮০–১১০ bpm) রাখতে ব্যবহৃত হয়:
- বিটা-ব্লকার (যেমন: মেটোপ্রোলল, বিসোপ্রোলল, অ্যাটেনোলল)।
- নন-ডিহাইড্রোপাইরিডিন ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার (যেমন: ডিলটিয়াজেম, ভেরাপামিল)।
- ডিজক্সিন (বিশেষ করে যাদের হার্ট ফেইলিউর রয়েছে)।
৩. রিদম নিয়ন্ত্রণ ও কার্ডিওভার্সন (Rhythm Control)
হৃৎপিণ্ডকে পুনরায় স্বাভাবিক সাইনাস রিদমে ফিরিয়ে আনা:
- ফার্মাকোলজিক্যাল কার্ডিওভার্সন: অ্যান্টিঅ্যারিথমিক ওষুধ—যেমন অ্যামিওডারন, ফ্লেকাইনাইড, প্রোপাফেনন বা ইবুটিলাইড প্রয়োগ।
- ইলেকট্রিক্যাল কার্ডিওভার্সন (DCCV): অ্যানেস্থেশিয়ার অধীনে ডিফিব্রিলেটরের মাধ্যমে বুকের ওপর সিনক্রোনাইজড বৈদ্যুতিক শক দিয়ে তাত্ক্ষণিক স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনা।
৪. ইন্টারভেনশনাল ও সার্জিক্যাল পদ্ধতি
- ক্যাথেটার রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন (Catheter Ablation): কুঁচকির শিরা দিয়ে সরু তার হৃৎপিণ্ডে প্রবেশ করিয়ে পালমোনারি শিরার সংযোগস্থলের যেসব অস্বাভাবিক কোষ থেকে বিশৃঙ্খল সংকেত তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকে তাপরশ্মি (Radiofrequency) বা ঠান্ডার (Cryoablation) সাহায্যে নিষ্ক্রিয় করা।
- পেসমেকার ও এভি নোড অ্যাবলেশন: ওষুধে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্রে এভি নোড বিচ্ছিন্ন করে স্থায়ী পেসমেকার স্থাপন।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ Heart Disease Other Related Conditions – CDC, ২০১৪।
- ↑ Zoni-Berisso, M., et al. (2014). Epidemiology of atrial fibrillation: European perspective. Clinical Epidemiology, 6, 213–220. PMID 24966695.
- ↑ Munger, T. M., et al. (2014). Atrial fibrillation. Journal of Biomedical Research, 28(1), 1–17. PMID 24474959.
- ↑ Anumonwo, J. M., & Kalifa, J. (2014). Risk Factors and Genetics of Atrial Fibrillation. Cardiovascular Research.
- ↑ Ferguson, C., et al. (2013). Atrial fibrillation: stroke prevention in focus. Australian Family Physician.
- ↑ Kirchhof, P., et al. (2016). 2016 ESC Guidelines for the management of atrial fibrillation. European Heart Journal, 37(38), 2893–2962.
- ↑ Freedman, B., Potpara, T. S., & Lip, G. Y. (2016). Stroke prevention in atrial fibrillation. Lancet, 388(10046), 806–817.
- ↑ Apixaban is safer and more effective than rivaroxaban for non-valvular atrial fibrillation – Therapeutics Initiative, ২০২৪।
